এ আর আজাদ সোহেল, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধিঃ
নোয়াখালী সদর উপজেলার ১নং চরমটুয়া ইউপির উদয় সাদুর হাট (ওদারহাট বাজার) মাছ ব্যবসায়ীদের অন্যত্র চলে যাওয়ার ফলে বাজারের ক্রেতা সমাগম বহুগুণ কমে গেছে। মাছ ব্যবসায়ীরা ঐতিহ্যবাহী এ বাজার ছেড়ে দিয়ে চরমটুয়া মৌলভী টোলা (সাবেক চরমটুয়া বাজার) মাদ্রাসার জায়গায় নতুন ভাবে বাজার গড়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। এতে একদিকে বাজার ক্রেতা শুন্য হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ইজারাদার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং প্রতিদিন বড় অংকের লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।
বাজার কমিটির সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র মাছের বাজার। মাছ কিনতে আসা ক্রেতারা বাজারের অন্যান্য দোকান থেকেও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করেন। কিন্তু মাছের আড়ত বা বাজারটি স্থানান্তরিত হওয়ায় ক্রেতাদের আনাগোনা কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ীদের বিক্রির ওপর।

ইজারাদার ইজারাদার মোঃ সাহাদাত হোসেন রিয়াজ জানিয়েছেন, তিনি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬৫ লাখ টাকা মুল্যে উদয়সাধুর হাট বাজার ইজারা নেন। ব্যবসায়িক পরিবেশের অবনতির কারণে এবং মাছ ব্যবসায়ীরা বাজার ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি। এক সময়ের স্বনামে খ্যাত জমজমাট ঐতিহ্যবাহী এই বাজারের প্রধান আয়ের উৎস ছিল মাছের বাজার। যা এখন প্রায় শূন্য।
এতে বাজারের রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে বসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ঠিক কি হয়েছে এবং কেনো তারা এমন করছেন তা বুঝতে পারছেন না। তিনি প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছেন। মুলত সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব ফাঁকি দিতেই তারা এমনটি করছেন বলে ইজারাদার অভিযোগ করেন।
এদিকে ক্ষুদ্র ও পাইকার মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, গত ১লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) আড়ৎদাররা ব্যবসা স্থানান্তরিত করেন। তারা প্রায় ৬ শত পাইকার ছাড়াও হাজার হাজার ক্রেতা এখন মাছ,মাংস,সব্জির জন্য ভিড় জমান ১৯ নং চরমটুয়া ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন মৌলভী টোলা এ বাজারে। এর একমাত্র কারন দীর্ঘ দিনের বৈষম্যের লালিত ক্ষোভ। উদয়সাধুর হাট বাজারে জলবদ্ধতার সময় রাস্তায় বসতে গেলে অন্য ব্যবসায়ীরা খারাপ ব্যবহার করেন। ইজারাদারেরা রসিদ বিহীন ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত কর আদায় করেন। তাই তারা আড়ৎদারদের সাথে বাধ্য হয়ে বাজার বর্জন করেছেন। বর্তমানে তারা বাজারের অদূরে এই চরমটুয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
ইশান ফিস হাউজ আড়ৎদার ও ব্যবসায়ীদের নেতা মোসলে উদ্দিন জানান, উদয়সাধুর হাট বাজারে বাজারের কোন ঘর ভিটিই সরকারি না। সব ব্যক্তি মালিকানা। তারা ব্যক্তি মালিকানা ঘর ভাড়া নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। এর পর বর্ষাকালে বাজারে হাটু পরিমান পানি উঠে জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পানি নিস্কাসনের কোন ব্যবস্থা নাই। সরকার বাজার ইজারা দিলেও পরিকল্পিত কোন ব্যবস্থা গ্রহন না করায় তাদের অনেক কষ্ট পোহাতে হয়।
এরপর ইজারাদার রা তাদের ইচ্ছে মতো রসিদ বিহিন চাঁদা আদায় করেন। ব্যবসায়ীরা ব্যাংক লোন নিয়ে ব্যবসা করেন। মালিকের ঘর ভাড়া,কর্মচারির বেতন,কারেন্টবিল এসব দিতেই হিমসিম খেতে হয়। তাই ইজারাদারের চাঁদা দিয়ে ব্যবসা চালানো মোটেও সম্ভব না। তার চেয়ে রাস্তায় বসে ব্যবসা করার ভালো।
সহিদ মাছের আড়ৎতদার ব্যবসায়ী মাকসুদুর রহমান জানান, এ বাজারে ছোট বড় প্রায় ৫-৬শ পাইকার মাছ কেনা বেচা করে থাকেন। প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ টাকা থেকে ৮-১০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়ে থাকে। ইজারাদার লাখে ২.৬% করে রসিদ বিহিন রাজস্ব দাবি করেন। দৈনিক গড়ে ১৫ -২০ হাজার করে মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা থেকে ৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সমস্যা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নাই। তাহলে আমরা কেনো রাজস্বের নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিবো। তাই সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এ বাজার বর্জন করেছি।
জাফর মাছের আড়ৎ, হোসেন মাছের আড়ৎ,,জামাল মাছের আড়ৎ,হাসেম মাছের আড়ৎ এর সত্ত্বাধিকারীরা জানান, বাজারে জলবদ্ধতার কারনে ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ীরা রাস্তায় বসতে চাইলে অন্য ব্যবসায়ীরা বাধা দেয়। গালমন্দ করে। বৈষম্য সৃষ্টি করে বলে তোমরা ১৯ নং চরমটুয়ার লোক সেখানে চলে যাও। তাছাড়া বাজারে মাছ আনা নেয়া পরিবহন রাখার কোন জায়গা নাই।
অনেক সমস্যা বলে শেষ করা যাবে না। বাজার ইজারার রাজস্ব নিতে সবাই আসে কিন্তু বাজারের পরিবেশ রক্ষায় কোন প্রদক্ষেপ কেউ নিতে চান না। তাই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা এ বাজার ছেড়ে দিছি। বর্তমানে অস্থায়ী ভাবে মৌলভী টোলা মাদ্রাসার সামনে আছি। নোয়াখালী ৪ আসনের এমপি মোঃ শাহজাহান ভাই ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে স্থায়ী ভাবে ব্যবসার একটা সুব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় উদয়সাধুর হাট বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, "মাছ ব্যবসায়ীরা বাজারের মূল আকর্ষণ ছিলেন। তাদের অভাবে বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। ইজারাদারের উচিত ছিল তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করে বাজারে ধরে রাখা। এখন মাছ ব্যবসায়ীরা নেই, ফলে ইজারাদারও টাকা পাচ্ছেন না, আবার দোকানদাররাও ক্রেতা পাচ্ছেন না।"তবে ইজারাদার অনেক বেশি লোকসানে পড়বেন। তাই এসমস্যার সমাদান দরকার।
এক কথায় উদয়সাধুর হাট বাজারের এই সংকটময় পরিস্থিতি নিরসনে স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, ইজারাদার এবং মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু সমাধান হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় বাজারের ঐতিহ্য হারানোসহ ইজারাদার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনি সাধারণ মানুষও দৈনন্দিন কেনাকাটায় দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তিতে পড়বেন।
সচেতন নাগরিকরা অভিমত প্রকাশ করে বলেন, উদয় সাদুর হাট বাজারটি স্বাধীনতার পুর্ব থেকে অনেক পুরোনো বাজার যা গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এটা নোয়াখালী জেলার একটি ঐতিহ্য বাজার। একসময় বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা কেনাকাটা করতে এ বাজারে আসতেন। এ বাজারে পাওয়া যেতো পাটি পাতা,ধান, চাল, বিভিন্ন মসলা। দেশি পুকুর ও নদীর নামি দামি মাছ। বর্তমানে এসব বিলুপ্তির পথে।
তারা মনে করেন, মাছ ব্যবসায়ীদের এমন স্থানান্তর বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতা নষ্ট করবে । অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন ও বাজার তদারকি কমিটিকে এই জলবদ্ধতা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ইজারাদারের রসিদ বিহীন চাঁদা আদায় ও অন্যান্য ব্যবসায়ীদের বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।