সুবর্ণচর (নোয়াখালী) প্রতিনিধি :
নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে লিখে রেখেছেন, "চরিত্র অর্জন করো, সবাই ভালোবাসবে।" নিয়মিত ধর্মীয় ও নৈতিকতা বিষয়ক পোস্টও করেন। অথচ সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই উঠেছে ধর্ষণচেষ্টা, ইভটিজিং, নারীদের অনলাইনে হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, আর্থিক অনিয়ম ও চুরিসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ। এতসব অভিযোগের পরও তিনি এখনও ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে বহাল থাকায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত মো. নুর আলম সিদ্দিক (২৪) নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চরলক্ষী গ্রামের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও মো. কামাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি বর্তমানে ডিগ্রি পর্যায়ে অধ্যয়নরত এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলা দক্ষিণের অধীন সুবর্ণচর পূর্ব শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নারী, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নারীকে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও আপত্তিকর বার্তা পাঠিয়ে হয়রানি করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব, ইভটিজিং এবং ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। একাধিক তরুণী জানান, তিনি বিভিন্ন সময় প্রেমের প্রস্তাব ও অনৈতিক বার্তা পাঠিয়ে তাদের বিব্রত করেছেন। এ ধরনের কয়েকটি কথোপকথনের স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের হাতেও এসেছে। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থে সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে একই এলাকার এক প্রবাসীর স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননীর ঘরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে ধর্ষণের চেষ্টা করেন নুর আলম সিদ্দিক। ওই নারীর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে হাতেনাতে আটক করেন। পরে উত্তেজিত জনতা তাকে গণপিটুনি দিয়ে মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে থানায় সোপর্দ করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, পরবর্তীতে মুচলেকা দিয়ে তিনি ছাড়া পান।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে স্থানীয় ইউপি সদস্য শামসুল আলম বাহার বলেন, "ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত থানা পুলিশের সহযোগিতায় সুরাহা হয়।" স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের উত্যক্ত করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য আয়েশা বেগম বলেন, "ঘটনাটি সত্য। এছাড়া বিভিন্ন সময় ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে।"
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই ঘটনার পরও তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং এখনও বিভিন্ন নারী ও শিক্ষার্থীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরক্ত করা এবং অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকও দাবি করেন, অনেক ছাত্রী তার আচরণে আতঙ্কিত।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি একটি কীটনাশক কোম্পানিতে কর্মরত অবস্থায় একাধিকবার ডিলারের কমিশন আত্মসাতের অভিযোগে তিনি চাকরিচ্যুত হন। এ বিষয়ে স্থানীয় ডিলার লোকমান হোসেন বলেন, "কমিশন আত্মসাতের অভিযোগে তাকে আগে সতর্ক করা হলেও একই কাজ অব্যাহত রাখায় কোম্পানি তাকে চাকরিচ্যুত করতে বাধ্য হয়।"
এছাড়া এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা চুরির ঘটনায়ও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একাধিকবার পরিবারের সদস্যদের কাছে বিষয়গুলো জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, এতসব অভিযোগের পরও তিনি এখনও সংগঠনের পদে বহাল থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংগঠনকেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলা দক্ষিণ শাখার সভাপতি সাইফুল ইসলাম ফারাবী বলেন, "আমাদের সংগঠন নৈতিকতার সংগঠন। আমাদের এই কর্মীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে অবশ্যই সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" অভিযোগের পরও কেন এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমাদের কাছে আগে কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আসেনি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত মো. নুর আলম সিদ্দিক বলেন, "এসব অভিযোগ সত্য নয়। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।" ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, "এটি আগের ঘটনা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় সমাধান হয়ে গেছে।"