মো. রেদওয়ান হোসেন, সুবর্ণচর (নোয়াখালী) প্রতিনিধি :
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় নিহত অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর আমান উল্লাহ ইউনিয়নের চর বজলুল করিম গ্রামের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে। ঘটনার পর শনিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তার বাবা সুজিত মজুমদার ও মা আম্পরি মজুমদার।
সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। তাদের ভাষ্য, ছেলের এমন পরিণতিতে তারা যেমন শোকাহত, তেমনি তার কর্মকাণ্ডের কারণে লজ্জিতও। অশ্রুসিক্ত চোখে অন্তরের মা বলেন, "আল্লাহ যেন আর কোনো মা বাবাকে এমন সন্তান না দেন।"
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তর দীর্ঘদিন ধরে নিজ এলাকায় থাকতেন না। তিনি বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান ফল বিক্রির কাজ করতেন বলে পরিবারকে জানাতেন। তবে পরিবারের দাবি, তিনি নিয়মিত কোনো অর্থ বাড়িতে দিতেন না, বরং বিভিন্ন সময় বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে যেতেন।
অন্তরের মা অভিযোগ করেন, কয়েকদিন আগে ছেলে তাকে মারধর করে এনজিও থেকে নেওয়া প্রায় ৫০ হাজার টাকা এবং আরও ১০ হাজার টাকা ধার করে মোট ৬০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। বাড়ির দরজায় ধারালো অস্ত্রের কোপের দাগ দেখিয়ে তিনি বলেন, টাকা না পেয়ে ছেলে প্রায়ই ভয়ভীতি প্রদর্শন করত এবং তাকে মারধর করত।
পরিবারের সদস্যরা জানান, অন্তরের বাবা সুজিত মজুমদার প্রায় ১০ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারান। বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। সংসার চালাতে কখনো কখনো দিনমজুরের কাজ করেন অন্তরের মা। পরিবারে অন্তরের এক বড় বোনও শারীরিক প্রতিবন্ধী।
এলাকাবাসী জানান, অন্তর খুব কমই গ্রামে আসতেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে তেমন মেলামেশা করতেন না। কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে আবার চলে যেতেন। কয়েক মাস আগে ফেনীতে তরমুজ বিক্রিকে কেন্দ্র করে একটি ঘটনায় তিনি সমস্যায় পড়েছিলেন। পরে অন্তরের মা ধারদেনা করে অর্থের ব্যবস্থা করে তাকে ফিরিয়ে আনেন বলে স্থানীয়রা জানান।
এলাকার সচেতন মহলের ধারণা, অল্প বয়সে বাড়ি ছেড়ে দীর্ঘদিন পরিবারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় অন্তর অপরাধপ্রবণ কিছু ব্যক্তির সংস্পর্শে গিয়ে অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারেন। তবে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, অন্তরকে এলাকার মানুষ খুব একটা চিনতেন না। কারণ তিনি দীর্ঘদিন এলাকাবহির্ভূত থাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। তার বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ স্থানীয়ভাবে প্রচলিত থাকলেও সেগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিষয়গুলো তদন্তাধীন রয়েছে।
চর জব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল হাসান জানান, ময়নাতদন্ত শেষে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অন্তর মজুমদারের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে নিজ গ্রামের শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৫ জুন সকালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের একটি বাড়িতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক নারী ও তার তিন মেয়েকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর মজুমদারের নাম উঠে আসে। পরে পালানোর সময় স্থানীয় জনতার গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি হাসপাতালে মারা যান। ঘটনাটি নিয়ে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে এবং প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।