আবুল হোসেন, রাজবাড়ী জেলা প্রতিনিধি
অনিয়ম, দুর্ণীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার মহোৎসব চলছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের ওয়েস্টার্ন জোন পাওয়ার ডিসট্রিভিউশন কোম্পানী লিঃ (ওজোপাডিকো) এর অফিসে। এতেকরে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিদ্যুতের গ্রাহকরা।
গ্রাহকদের মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, আবাসিক সংযোগকে বানিজ্যিক আবার বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আবাসিক সংযোগ, নতুন সংযোগ দিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ নানা ধরনের অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার তথ্য উঠে আসে অনুসন্ধানে। ওজোপাডিকে গোয়ালন্দ অফিসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন গ্রাহকদের তথ্য ও অন্যান্য তথ্য চাইলেও দিনের পর দিন ঘুরিয়ে বিভিন্ন টালবাহনা করে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি করেন কার্যালয়ের আবাসিক প্রকৌশলী।

গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নতুন পাড়া গ্রামের প্রবাসী আব্দুল কাদেররে স্ত্রী রেহেনা খাতুনের সাথে কথা হয়। তিনি চোখের পানি ফেলে বলেন, ‘আমার স্বামী প্রবাসে থাকেন। আমি সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে থাকি। আমার বাড়িতে নিয়মিত যে বিদ্যুত বিল আসতো তা হঠাৎ করে কিছুটা কমে যায়। বিষয়টি আমি বিল রিডার ও লাইনম্যানদের জানাই। কিন্তু তারা মিটার দেখে বলেন, মিটার ঠিক আছে, সমস্যা নেই। এরই মাঝে হঠাৎ একদিন তার ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক মিটার বিদ্যুত বিভাগের লোকজন খুলে নিয়ে তাকে অফিসে যেতে বলে চলে যায়।
’ তিনি কোন উপায়অন্ত না পেয়ে দ্রুত চলে যান বিদ্যুত অফিসে। অফিস থেকে তাকে বিদ্যুত চোর বলে চরম ভাবে অপমান করা হয় এবং বলা হয়, ‘আপনার মিটারে সমস্যা আছে, দ্রুত ১ লাখ টাকা না দিলে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। সেই সাথে বিষয়টি কারো সাথে আলাপ করা যাবে না। গোপন রাখতে হবে। এসময় তিনি কান্নাকাটি করে ৬০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে মামলা থেকে রেহাই পান। এ টাকার বিপরীতে তাকে কোন ভাউচার/স্লীপ দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রেহেনা খাতুন বলেন, ‘না আমাকে কোন রশিদ বা কোন প্রকার কাগজপত্র দেয় নাই।’
উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব তেনাপচা গ্রামের আব্দুল জলিল ফকির বলেন, ‘বিদ্যুত বিভাগের লোকজন আকষ্মিক ভাবে আমার বাড়িতে আসে।’ এসময় তারা বলেন, ‘আপনার বাড়ির মিটারে সমস্যা আছে, বিল কম উঠে।’ আমি তাদের বলি, ‘ ঠিক আছে, আমার মিটারে যদি কোন সমস্যা থাকে তবে আপনারা অন্য মিটার দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন।’ তারা একাধিক মিটার দিয়ে পরীক্ষা করলেও আমার মিটারে কোন সমস্যা ধরা পরে নাই। এরপর তারা আমার কোন কথা না শুনে আমার মিটার বিকলের অযুহাতে আমাকে মামলার ভয় দেখিয়ে ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে। পড়ে আমি বাধ্য হয়ে তাদেরকে ১ লাখ টাকা দেই এবং আরো ১০ হাজার টাকা দেই নতুন প্রিপেইড মিটার লাগানোর জন্য।
গত ২২ জুলাই নিজ দোকানেই কথা হয় গোয়ালন্দ পৌরজামতলা বাজারের ছোট্ট খাবারের দোকানী আবুল কালামের সাথে। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের কর্মচারীরা আমার দোকানে খেয়ে ঠিকমত টাকা দিত না। এ নিয়ে আমি একটু বাগবিতান্ডা করায় তারা উদ্দেশ্যমূলক ভাবে আমার বাড়ির সংযোগ আবাসিক থেকে বানিজ্যিক করে দেয়। আগে যেখানে ৬/৭শ টাকা বিল আসতো, এখন আমার বিল আসে ৩ হাজার টাকার উপরে। দীর্ঘদিন অফিসে ঘুরেও এখনো পর্যন্ত আমি তা আবাসিক করতে পারিনি।’
নিয়ম অনুযায়ী খাম্বার সাথে কোন মিটার লাগানোর সুযোগ না থাকলেও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ বিদ্যুত অফিসের সামনেই চোখে পড়ে একটি বৈদ্যুতিক খাম্বার সাথে ঝুলছে একটি সংযোগ মিটার। গত ৩০ জুলাই সেই মিটার থেকে বিদ্যুত লাইন অনুসরন করে এগিয়ে যেতেই দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ফসলের মাঠের ভেতর দিয়ে চরম ঝুকিপূর্ণ ভাবে অন্তত ২ হাজার মিটার দুরে একটি মুরগীর ফার্মে ওই বিদ্যুতের সংযোগ। ওই মুরগীর ফার্মে গিয়ে দেখা হয় ফার্মের মালিক সুমন মোল্লার সাথে। তিনি জানান, পূবে তিনি পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিয়েছিলেন। সে সময় তার বিদ্যুত বিল আসতো ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। বর্তমানে তিনি ওজোপাডিকোর বিদ্যুত লাইন ব্যবহার করেন। বিল আসে মাত্র ৫/৬শ টাকা। এসময় বিল কি তিনি নিজে দেন নাকি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘২/৩ মাস পরপর বিদ্যুত অফিসের লোক এসে বিল নিয়ে যান।’ তার কাছে একটি বিদ্যুত বিলের কাগজ দেখতে চাইলে তিনি একটি বিলের কাগজ দেখান। তাতে দেখা যায় তার সংযোগটি আবাসিক হিসেবে দেয়া হয়েছে। অথচ তিনি বানিজ্যিক ভাবে বিদ্যুত ব্যবহার করছেন।
বাড়ীতে নতুন মিটার স্থাপনের জন্য ১১ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে বিদ্যুৎ অফিসে। সংযোগ তার সার্ভিসের জন্য আলাদা টাকা খরচ করতে হয় গ্রাহকদের। নতুন সংযোগে নিতে অতিরিক্ত টাকা দিলে লাগেনা কোন বাড়ির কাগজপত্র।
গোয়ালন্দ উপজেলা বিএনপি'র সিনিয়র সহ-সভাপতি মো: আইয়ুব আলী খান, বলেন, গোয়ালন্দ বিদ্যুৎ অফিসে চুরি বলবো না এরা ডাকাত। ২৬'শত টাকার সংযোগ ১০ হাজার থেকে ১৫ টাকা নেয়। সাধারণ মানুষ, কৃষক সংযোগ সময় মতো পায় না। সেবার নামে গ্রাহকদের টাকা চুরি, ডাকাতি করছে বিদ্যুৎ অফিস । গোয়ালন্দ বিদ্যুৎ অফিসে থেকে চুরি, ডাকাতি উৎখাত করতে হবে।
গোয়ালন্দ উপজেলা আবাসিক প্রকৌশলী মো: তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সংযোগ ফি বাবদ অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সুযোগ নাই। সরকারি ফি ২৬'শত টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা মধ্যে নেওয়ার কথা।
সিন্ডিকেটে কেও জড়িত থাকলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রশিদ ছাড়া টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্টিবিউশন কোম্পানি লি : এর রাজবাড়ী জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মামুন -অর- রশিদ অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি।