Friday , 4 April 2025

নবাবগঞ্জে বাঙ্গির গ্রাম ও বাজার মম ঘ্রাণ

॥ বিশেষ প্রতিনিধি ॥

বাবগঞ্জের ভাঙ্গাভিটার খেত থেকে বাঙ্গি তুলে বিক্রির জন্য হাঁটে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা।

ভোরের আলো তখনো ঠিকমতো ফোঁটেনি। কৃষকেরা ব্যস্ত জমি থেকে বাঙ্গি তুলতে। সকাল ছয়টার আগেই বাঙ্গিগুলো হাটে নিতে হবে

 

কৃষাণী মহারনী রায় বলেন, তার ছেলে তিন বিঘা জমিতে বাঙ্গি চাষ করে ভালো লাভ করেছে। তবে প্রতি বছর এমন হয় না। লোকসানের ভয়ে অনেকেই এবার এ ফলের চাষ করেননি।

তা না হলে বাঙ্গিগুলো বিক্রি করার জন্য দিনভর অপেক্ষা করতে হবে। এঅবস্থা ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কৈলাইল ইউনিয়নের ভাঙ্গাভিটার।

গত বুধবার ভোরে বাঙ্গির গ্রাম হিসেবে পরিচিত জায়গাটিতে গিয়ে দেখা যায়, সকালের হাট ধরতে কৃষকদের তোড়জোড়। খেত থেকে বাঙ্গি উঠিয়ে ভ্যানে রাখছেন। কৃষকেরা জানান, তাদের এলাকার বাঙ্গির সুনাম সারা দেশে রয়েছে। শুধু এই ফলকে কেন্দ্র করে এ মৌসুমে ভাঙ্গাভিটা ইছামতীর পাড়ে প্রতিদিন সকাল-বিকেল দুই বেলা বসে বাঙ্গির হাট।

গ্রামের ২০০ হেক্টর জমিতে বাঙ্গি চাষ হয় বলে জানান এ অঞ্চলের কৃষকেরা। প্রায় ১৮০টি পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে এর ওপর। তারা জানান, মূলত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত বাঙ্গি চাষ হয়। বাকি সময় চলে আমন ধানের আবাদ।

ইছামতী নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় গ্রামটিতে। ঢাকা-নবাবগঞ্জ সড়কের পাশে মরিচা ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা নৌকা নিয়ে যাওয়া যায় ভাঙ্গাভিটার বাঙ্গির হাটে। নদীপথে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের পথ।

সরেজমিন দেখা যায়, বাঙ্গির ম ম গন্ধ এলাকাজুড়ে। গাঁয়ের মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে গেলে বাঙ্গির ঘ্রাণ নাকে আসে। নবাবগঞ্জের কৈলাইল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম ভাঙ্গাভিটায় বাঙ্গির চাষ হচ্ছে প্রায় শত বছর ধরে। হিন্দু অধ্যুষিত ভাঙ্গাভিটার পূর্বপুরুষের এ শখের কাজটি যেন এখন অনেকের কাছে ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই এলাকাজুড়ে দেশের কোথাও এমন মৌসুমি ফল চাষ হয় বলে জানা নেই কারো। তবে ভাঙ্গাভিটা এলাকায় এ বাঙ্গি চাষে ঢাকার আশাপাশে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছে।

ভোরের সূর্য উঁকি মারছে। এমন সময়ের আগেই কৃষক ক্ষেতে গিয়ে বাঙ্গি তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পাইকারি ক্রেতারা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে এ ফলটি কিনে বাজারে বিক্রি করেন। কাক ডাকা ভোরে তারাও হাজির এ গ্রামে। কেউ রাস্তা থেকে কিনছেন। আবার কেউ নদীর পাড়ে নৌকা নিয়ে ভর্তি বাঙ্গি কিনে পসরা সাজিয়ে ফিরছেন নিজ এলাকার হাট বাজারে। বসন্তের ভোরের সকাল যেন ওই এলাকার মানুষের কাছে অনেকটা মেলার মতো।

সকাল হলেই ঢাকা শহর ও তার আশপাশের জেলা থেকে ফড়িয়ারা ভিড় জমান এখানে। তবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। সেই তুলনায় দামও পাচ্ছে কৃষক। তারা অনেকটাই খুশি। ভোর হতে কঠোর পরিশ্রম করলেও কৃষকের মুখে হাসি যেন লেগেই আছে।

ক্রেতা রশিদ মোল্লা বলেন, তিনি এ মৌসুমে প্রতিদিন সকালে এ ফল কিনে নবাবগঞ্জের বিভিন্ন বাজার বিক্রি করেন। ছোট বড় আকৃতি ভেদে দাম উঠানামা করলেও সরাসরি কৃষকের নিকট হতে তিনি ঝাকা চুক্তিতে বাঙ্গি কিনছেন। প্রতি ঝাকার দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এতে গড়ে প্রতিটি বাঙ্গির দাম ৩৫ থেকে ৪০টাকা কেনা হচ্ছে। বিক্রি করছেন ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।

তবে ঘাটতি আছে বলেও জানান তিনি। ভোর সাড়ে ৪টা থেকে কৈলাইল ভাঙ্গাভিটা সড়কে গাড়ির বহর জমে। তারা এ বাঙ্গি কিনতে আসেন বলে জানান। তেমনি একজন মফিজ উদ্দিন। তিনি এসেছেন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার রাজানগর থেকে। প্রায় ৫শত পিস বাঙ্গি কিনে ট্রলারে তুলেছেন।

তিনি বলেন, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও নারায়নগঞ্জে আশপাশে এ রকম বাঙ্গির চাষ আর কোথাও নেই। এখানে কিনতে এবং পরিবহনে বেশ সুবিধা। এছাড়া ভাঙ্গাভিটার বাঙ্গি ঐতিহ্য ভিন্ন। স্বাদেও ভিন্ন। ভাঙ্গাভিটার বাঙ্গি মানেই এই গরমের সিজনে গ্রাহকের কাছ অন্য রকম চাহিদা। তাই এখান থেকে কিনে বিক্রি করি।

বাঙ্গিচাষি শ্যামল মন্ডল বলেন, চার দশক ধরে এ ফলের চাষ করেন। এবারও প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে এ বাঙ্গির চাষ করেছেন। সারা বছর এ কৃষির আয় থেকেই তার সংসার চলে। মোটামুটি দাম পেয়ে অনেকটাই খুশি তিনি। প্রায় চার মাস কষ্ট করে এ ফলটি বিক্রির উপযোগী হয়। ফাল্গুন মাসের শুরু থেকে চৈত্রের প্রথম সপ্তাহেই শেষ হয়ে যায়।

কৃষক বাদল সরকার সরাসরি ক্ষেতে বসেই বাঙ্গি বিক্রিতে ব্যস্ত। তিনি বলেন, এবছর বেশ ভালো উৎপাদন হয়েছে। আমার ৫ লাখ টাকা পুঁজির পুরোটাই ক্যাশ করেছি। আরো ৫/৬ লাখ টাকা বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।

রতন মন্ডল বলেন, তিনি ১৩ বিঘা জমিতে বাঙ্গি বুনেছেন। খরচ হয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকা। এরমধ্যে লাখ তিনেক বিক্রি করেছেন। বাকি সময়ে চালান উঠে লাভ হবে বলে আশা তার। শ্যামবাজার ও কাওরান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসেন। তারা বিপুল পরিমাণ বাঙ্গি কিনেন। এরপর নৌকা ও ট্রাকযোগে নিয়ে বিক্রি করেন।

কৃষাণী মহারনী রায় বলেন, তার ছেলে তিন বিঘা জমিতে বাঙ্গি চাষ করে ভালো লাভ করেছে। তবে প্রতি বছর এমন হয় না। লোকসানের ভয়ে অনেকেই এবার এ ফলের চাষ করেননি।

শ্রীদাম বেপারী (৮২) বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই এখানে বাঙ্গি চাষের একটা ঐতিহ্য আছে। আর ভাঙ্গাভিটার বাঙ্গির কদর দেশজুড়েই। এটা কম মিষ্টি ও রসালো ফল। ইফতারে এ ফলটি বেশ লোভনীয় সবার কাছে। গরমের আরামে বাঙ্গি অনেকটাই তৃষ্ণা নিবারণ করে।

মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর থেকে বাঙ্গি কিনতে আসা আবজাল হোসেন বলেন, তিনি সাত-আট বছর ধরে ভাঙ্গাভিটা থেকে বাঙ্গি কিনে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন হাটে বিক্রি করেন। এবার পবিত্র মাহে রমজান মাস পাওয়াতে বাঙ্গির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিক্রি ও লাভ ভালো বলে জানান এই ব্যবসায়ী।

এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসমা জানান, নবাবগঞ্জের ভাঙ্গাভিটা এলাকার বাঙ্গির সুনাম সারা দেশেব্যাপী রয়েছে। বিষয়টি মাথায় রেখে আমি নিজে বেশ কয়েকবার সরেজমিন কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের পরামর্শ দিয়েছি। এ বছর ২০০ হেক্টর জমিনে বাঙ্গি চাষ করা হয়েছে ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। অল্প খরচ হওয়াতে এ ফলটি কমবেশি সবাই চাষ করেন বলেও জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।

Check Also

রায়পুরায় ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতিকে লক্ষ করে গুলি, প্রতিবাদে সড়কে আগুন, যান চলাচল ব্যহত

॥ সাদ্দাম উদ্দিন (রাজ), নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি ॥ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার অলিপুরা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড …