॥ মাসুদ রানা, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি ॥
বি শ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের নদ-নদীতে এখন চলছে বিষ দিয়ে বা কারেন্ট জাল ব্যবহার করে অবৈধভাবে মাছ ও মাছের পোনা শিকারের মহাউৎসব। আর এই উৎসবের নেপথ্যে খোদ বন বিভাগের কর্মকর্তার মদদ ও মাসোহারা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। দুবলা ফরেস্ট স্টেশনের সহকারী কর্মকর্তা মোস্তাকিন বিল্লাহর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অভয়ারণ্য এলাকায় অবাধে চলছে এই লুণ্ঠন।
জেলে পল্লী দুবলা স্টেশনের ফরেস্ট রেঞ্জার (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মিলটন রায় বলেন, তার ষ্টেশন এলাকার কোকিলমনির বিভিন্ন খাল থেকে ৩টি ট্রলার সহ ২৫ জেলেকে আটকের ব্যাপারে তিনি শুনেছেন। তবে এর সাথে তার সহকারী কর্মকর্তা জড়িত থাকারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
তবে বন বিভাগের পৃথক দুটি অভিযানে ৩টি মাছ বোঝাই ট্রলারসহ ২৫ জেলেকে আটক করা হয়েছে। এসময় জব্দ করা হয়েছে ৪০০ কেজি পারশে মাছের পোনা। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বগী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ফরেস্টার দিলীপ মজুমদারের নেতৃত্বে বনরক্ষীরা সোমবার (৯ ফেব্রয়ারী) গভীর রাতে বলেশ্বর নদীতে নিয়মিত টহল দিচ্ছিলেন। এসময় সুন্দরবন থেকে ফিরে আসা একটি সন্দেহভাজন ট্রলার থামাতে বললে তারা দ্রুত চালিয়ে যাওয়ার চেষ¦টা করে। এসময় ধাওয়া করে ট্রলারটি আটক করা হয়। ট্রলারটিতে তল্লাশি চালিয়ে দেড়শ কেজি পারশে মাছের পোনা জব্দ করা হয়। এ সময় ট্রলারে থাকা ১০ জেলেকে আটক করে বগী ফরেষ্ট স্টেশনের বনরক্ষীরা।

আটক জেলেরা হলেন, ইমরান গাজী, গনি শেখ, সাহাবুদ্দিন শেখ, এনামুল শেখ, হাবিবুর শেখ, জুবায়ের মিস্ত্রী, সিরাজুল শেখ, আমিরুল শেখ, রহমান শেখ ও মহাসিন মিস্ত্রি। তাদের বাড়ি খুলনার দাকোপ ও পাইকগাছা এলাকায়। বনরক্ষীরা জানান, জেলেরা রাতের আঁধারে অবৈধভাবে ধরা পোনা নিয়ে পাইকগাছার দিকে যাচ্ছিল।
অপরদিকে, একইদিন (সোমবার) বিকেলে সুন্দরবনের কোকিলমোনি এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে বনরক্ষীরা আড়াইশ কেজি পারশে মাছের পোনা সহ আরও ১৫ জেলেকে আটক করে। এসময় কোকিলমনি বনরক্ষীদের অভিযানে তাদের ব্যবহৃত দুটি ট্রলারও জব্দ করা হয়। আর এসব মাছের পোনা ধরার অভিযোগের তির সহকারী বন কর্মকর্তা মোস্তাকিন বিল্লার সহ দুবলার ফরেষ্ট অফিসের কয়েক বনরক্ষীদের দিকে স্থানীয় সূত্র ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলেরা অভিযোগ করেছেন, সুন্দরবনের দুবলা ফরেস্ট স্টেশনের সহকারী কর্মকর্তা মোস্তাকিন বিল্লাহর ম্যানেজমেন্টে বনের নিষিদ্ধ অভয়ারণ্য এলাকায় মৎস্য শিকার চলছে।
কারণ, যে তিনটি ট্রলারে যারা আটক হয়েছে, তাদের সকলের বাড়ি কর্মকর্তা মোস্তাকিন বিল্লার বাড়ির একই এলাকায়। এছাড়া এসকল অবৈধ মাছ শিকারে ব্যাবহৃত ট্রলারগুলো দুবলার ফরেষ্ট অফিসের সামনেই বাধা থাককে। রাত হলেই তারা ওই অসাধু কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে বনের বিভিন্ন এলাকায় মাছ শিকার করে। জেলেদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা আদায় করে তিনি এই অবৈধ সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ। দুবলা স্টেশনের এই কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকায় জেলেরা নির্ভয়ে বনের ভেতরে সম্পদ ধ্বংস করছে।
তবে দুবলা ফরেষ্ট ষ্টেশনের সহকারী ষ্টেশন কর্মকর্তা মোস্তাকিন বিল্লা বলেন, বনের কোকিলমনির নিষিদ্ধ খালে অবৈধ ভাবে মাছ বা পাইশা পোনা ধরার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেনা, আর দুবলা ষ্টেশনের পাশে ট্রলার রাখার ব্যাপারে তার জানা নাই বলে জানান তিনি। জেলে পল্লী দুবলা স্টেশনের ফরেস্ট রেঞ্জার (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মিলটন রায় বলেন, তার ষ্টেশন এলাকার কোকিলমনির বিভিন্ন খাল থেকে ৩টি ট্রলার সহ ২৫ জেলেকে আটকের ব্যাপারে তিনি শুনেছেন। তবে এর সাথে তার সহকারী কর্মকর্তা জড়িত থাকারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মোঃ শরীফুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের নদ-নদীতে কোনো ধরনের অবৈধ মাছ শিকার বরদাশত করা হবে না। গোপনে সংবাদ পেয়ে পৃথক অভিযান চালিয়ে ট্রলার ও জেলেদের আটক করা হয়েছে। আটক জেলেদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। জব্দকৃত পোনা নদীতে অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
আর দুবলা ষ্টেশনের সত্যতা পাওয়া যায় তা হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বন বিভাগ মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সব সময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সচেতন মহলের মতে, পোনা আহরণকারী সাধারণ জেলেদের আটক করা হলেও এই সিন্ডিকেটের গডফাদার এবং বন বিভাগের ভেতর লুকিয়ে থাকা মদতদাতাদের চিহ্নিত না করলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
global sangbad 24 অনলাইন নিউজ পোর্টাল
