॥ মাসুদ রানা, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি ॥
মোং লা পৌর শহরের কয়েকটি মহল্লায় গড়ে উঠেছে মিনি পতিতালয়। আবাধ, অবৈধ যৌনতা, মাদক সেবন সহ স্বীকার হচ্ছে উঠতি বয়সী তরুন তরুনীরা । শহরের বাসা বাড়ীতে একাধিক নারীদের দিয়ে করানো হচ্ছে দেহ ব্যবসা। ঐ সকল স্পট গুলো মাদক সেবনের অভয়ারণ্যে। প্রভাবশালী অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে অনেকটা প্রকাশ্যই চলছে তাদের দৌরাত্ম।
কথা হয় মোংলার একজন দালালের সাথে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে দেহ ব্যবসার সাথে জড়িত। তিনি বলেন, আমাদের কাছে অনেক যৌনকর্মীর নাম্বার রয়েছে। আমরা কাষ্টমার এনে দেই। কাজ হলে আমরা কমিশন পাই। শুধু আমরাই কমিশন খাইনা পুলিশ, নেতা থেকে শুরু করে অনেকেই এ কমিশন বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিল আ.লীগের আমলে।
অনুসন্ধানে যানা যায়, মোংলা উপজেলার ৭ নং কলেজ রোড, কুমারখালি, বেড়িবাঁধ, এনিও পাড়া, চরকানা, বটতলা ও মাছমারার নারকেলতলা এলাকা, মাছমারা রোড, দ্বিগরাজের আপা বাড়ি, কানাইনগর ছাড়াও শহরের কয়েকটি ফ্লাট বাড়িতে ভাড়া রুম নিয়ে এমন অসামাজিক কার্যকলাপ চলে অহরাহ। মোংলা উপজেলা সহ পৌর এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে মিথ্যা তথ্যদিয়ে ভাড়া নিয়ে মিনি পতিতালয় তৈরী করে দুর-দুরন্ত থেকে নারীদের এনে অসামাজিক কার্যকলাপ, মাদক বেচা-কেনা ও উঠতি বয়সী যুবক-যবতীদের নিয়ে মাদকসেবীদের বসার আখড়া খানা সহ চলছে তাদের এই অবৈধ যৌনতার হাট।
পৌর ভবনের পাশেই প্রকাশ্যে দিন রাত ২৪ ঘন্টা মদ ইয়াবা সেবন, নারী দিয়ে দেহ ব্যাবসা সহ অনৈতিক ব্যাবসা করেন মরিয়ম নামের এক নারী। মরিয়মের এ পর্যন্ত ৫/৬ টি বিবাহ করেছেন বলে জানাযায়, প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর যাদের বিবাহ করেছেন সবাই তার অপকর্মের কথা জানার পর তার সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করেন । বর্তমানে তার স্বামী ইউসুফ। তিনি একজন কাপড় ব্যাবসায়ী।
মরিয়মের ডেরায় মৌসুমী ও মীম নামের দুই নারী দিয়ে দেহ ব্যাবসা করান তিনি। এছাড়াও শহরের যুবক যুবতীদের রুম ভাড়া দেন অনৈতিক কার্যকলাপের জন্য। তার এই অনৈতিক কর্মকান্ড মোংলার সকল জনগনের আলোচনার শীর্ষে। মুখে মুখে প্রতিবাদ করলে বাস্তবে কেউ পদক্ষেপ নেয় না ভয়ে।
তবে প্রশাসনের কাছে তথ্য থাকলেও অদৃশ্য কারণে ব্যাবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। আশপাশের সকল বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন তার এ ব্যাবসা হয়তো প্রভাবশালী যেকোন রাজনৈতিক নেতাদের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে প্রশাসন সহ সকলকে ম্যানেজ করে পরিচালনা করে মরিয়ম এ ব্যাবসা।
মোংলা উপজেলা ও পৌর শহরের একাধিক দালাল চক্র সক্রিয় ভাবে কাজ করছে। যারা মাঠ পর্যায়ে কাস্টমারদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে এবং সাথে করে স্পটে নিয়ে যায়। দালাল চক্রের হাত ধরে ছাড়া কোনো ভাবেই এদের অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যাবে না। খুলনা সহ মোংলার আশপাশের এলাকা থেকে এ সকল ভাসমান পতিতাদের এনে অনৈতিক কাজ করে মোংলার কিছু চিহ্নিত দালালরা।
খুলনা থেকে আসা এক যৌনকর্মীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন পেটের দায়ে এ পথে নেমেছেন। তাই এলাকা থেকে বিভিন্ন স্থানে দালালের মাধ্যমে ফোন পেলে চলে আসেন। সন্ধ্যার পর কাস্টমার বেশী হয় কেউ ঘন্টা চুক্তি আবার কেউ বা রাত চুক্তি। দালালকে চুক্তি ভিত্তিক টাকা দিতে হয় তাদের। তবে তাদের কাস্টমার বেশীর ভাগ উঠতি বয়সি ইয়াবা সেবন কারী তরুনরা। মোংলায় এ সকল কাজে প্রসাশনের তেমন নজরদারি না থাকায় তাদের ঝামেলা পোহাতে হয় না।
কৌশলে তার কাছে জানা যায়, মোংলা পৌর শহরের কুমারখালী ব্রিজের কিছু সামনে ডাঃ সিদ্দিকের বাড়িতে টাকার বিনিময়ে নিশ্চিন্তে যৌনকর্মীদের অনৈতিক কাজের নিরাপদ স্থান পাওয়া যায়। বাড়ির উঠানে বসে পাহাড়া দেয় দালাল ও বাড়ির লোকজন। ডাঃ সিদ্দিক নামে পরিচিত হলেও আসলে তিনি কোন ডাঃ না।
কথা হয় মোংলার একজন দালালের সাথে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে দেহ ব্যবসার সাথে জড়িত। তিনি বলেন, আমাদের কাছে অনেক যৌনকর্মীর নাম্বার রয়েছে। আমরা কাষ্টমার এনে দেই। কাজ হলে আমরা কমিশন পাই। শুধু আমরাই কমিশন খাইনা পুলিশ, নেতা থেকে শুরু করে অনেকেই এ কমিশন বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিল আ.লীগের আমলে।
মোংলার ছেলে পরিচয় না প্রকাশের শর্তে জানান, আমি আমার একটা বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারি একটা বাসা আছে যেখানে নিরাপদে বসে ইয়াবা সেবন করা যায়,তার সাথে সেখানে দুই দিন যাবার পরে, তৃতীয় দিনের দিন একটা মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, সেও আমার সাথে ইয়াবা সেবন করে, তার পরেই আমরা দুই জন পাশের রুমে ঘনিষ্ঠ সময় কাটায়। ঐ বাড়িতে মোংলার কিছু অসাধু ব্যাক্তি, ইয়াবাসেবনে আশক্ত হাতেগোনা কয়েকজন ব্যাবসায়ী, কার্গো জাহাজের নাবিকরা সহ অনেকে যাতায়ত করেন।
৭ নং কলেজ রোডে নিজস্ব বাড়িতে মিনি পতিতালয় তৈরী করে বিভিন্ন এলাকা থেকে উঠতি বয়সী নারীদের দিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপ ও নামী-দামী মানুষদের জিম্মি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে শাহ আলম ও তার স্ত্রী আমেনার নামে। তাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বাড়ির মালিক শাহ আলম, সহ এক যুবতী নারীকে ২০২৪ সালের ২৯ মার্চ গভীর রাতে আটক করেছিল মোংলা থানা পুলিশ।
৫ আগস্টের আগে ৩ নং ওয়ার্ডের ৭ নং কলেজ রোডের মাদক সেবন ও দেহ ব্যাবসার নিয়ন্ত্রণ করতো এলাকার আ.লীগের দুই তিন জন নেতা । পৌর শহরের কয়েকজন ওয়ার্ডের আ.লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর, মহিলা কাউন্সিলর এবং ওয়ার্ড আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক সহ কয়েকজনকে জনকে মোটা অংকের টাকা মাসিক মাসোহারা দিতেন আমেনা ও শাহ আলম বলে জানা যায়। খোদ সেই আ.লীগের সাবেক কাউন্সিলর নিজেই আমেনার বাসায় যাতায়ত করতেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আমেনা ও শাহ আলমের নিজস্ব বাড়িতে এ আসর বসে সন্ধ্যা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত। খদ্দের বেশি হলে চলে সারারাত। বর্তমানে আমেনা ও শাহ আলমের শেল্টারদাত বিএনপির কয়েজন নেতা। এদের এমন অসামাজিক কার্যালপের কারণে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ। অসামাজিক কার্যকলাপের ব্যাপারে জানাজানি হলে পাড়া মহল্লার ক্ষমতাধর ব্যাক্তিরা অনেকেই মাসোহারা নিয়ে থেমে যান। কেউ প্রতিবাদ করলে হেনস্তার শিকার হন বা তাকে থামিয়ে দেয়া হয়।
সম্প্রতি মোংলা পৌর শহরের শেহলাবুনিয়া এলাকার উঠতি বয়সি ছেলে মেয়েদের মধ্যকার ঝামেলায় হাতাহাতির এক পর্যায় জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯ কল পেয়ে মোংলা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান করার চেস্টা করেন । এবং দুই পক্ষকে শান্তিপূর্ণ ভাবে সরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে এ বিষয়ে আর কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
বাংলাদেশ সরকারের সহকারী এ্যার্টনি জেনারেল মোহম্মদ মনিরুজ্জামান মনির বলেন, সাংবাদিক মাসুদ রানা (রেজা মাসুদ) এর কাছ থেকে বিস্তারিত শোনার পর আমি হতভম্ব হই, যেহেতু আমার জন্মস্থান মোংলায়। মোংলার মানুষেরা তাদের সন্তানদের নিয়ে রয়েছেন দুঃশ্চিন্তায়, মাদক আর যৌনতার মতো বিষয় যেখানে সহজলভ্য হয় সেখানে সন্তান লালনপালন অসম্ভব হয়ে পড়ে। নিষিদ্ধ সবকিছুর উপরেই ছেলেদের আকর্ষন থাকে। তাই মোংলার সন্তান হিসাবে আমার চাওয়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্মুল অভিযান পরিচালিত করা হোক। অন্ধকার অশ্লীল ও ভয়ংকর মাদকের অভয়ারণ্যে থেকে রক্ষা করা হোক মোংলার আজ ও আগামীর প্রজন্মকে।
তিনি আরো বলেন আমি প্রশাসনকে ফোনে বা সরাসরি কথা বলে এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যাবস্থা গ্রহন করার কথা জানাবো এবং আইনজীবী হিসাবে আইনের মাধ্যমে এ সকল অপরাধীরা যাতে পার না পায় তার সার্বিক সহযোগিতা করার সর্বোচ্চ আশ্বাস দেন সহকারী এ্যার্টনি জেনারেল মোহাম্মদ মনির।
সুশাসনের জন্য নাগরিক – সুজন’র মোংলা উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মোঃ নুর আলম শেখ বলেন,সমাজকে ধ্বংস করতে মাদকই যথেষ্ট। যুব সমাজকে রক্ষা করতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে সকলকে সোচ্চার হতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরবতা ও শিথিলতার কারনে মাদকের এতো ছড়াছড়ি।
মোংলা থানার ওসি মোঃ আনিসুর রহমান বলেন পুলিশ এসব অপরাধের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। খুব তাড়াতাড়ি , অভিযান পরিচালনা করবেন উধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে।আবাসিক হোটেল, অনৈতিক কাজে ব্যাবহারিত বাসা বাড়ি সহ মোংলার বিভিন্ন স্থানে এসবের সাথে যারা জড়িত শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান থানার এ কর্মকর্তা।
রাতের অন্ধকারে ভাসমান পতিতা, খদ্দের ও দালালদের উৎপাতে অতিষ্ঠ স্থানীয় জামে মসজিদের মুসল্লীরাও। তাই এসব কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন মোংলা বাসী।