শুক্রবার , ১২ এপ্রিল ২০২৪

যন্ত্র বসলেও কোনদিন মেলে না আবহাওয়ার পূর্বাভাস

॥ আবুল হোসেন, রাজবাড়ী জেলা প্রতিনিধি ॥

কৃষি কাজে সুবিধার জন্য আবহাওয়ার আগাম তথ্য দেখানোর জন্য ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ভবনের সিড়ি’র পাশে একটি বোর্ড স্থাপন করা আছে। অথচ সেখানে কোনো তথ্যই নেই। যে যন্ত্রের মাধ্যমে এ বোর্ডে তথ্য হালনাগাদ হয়, সেটি থাকার কথা ভবনের ছাদে, কিন্তু সেখানে ওই যন্ত্রটিও নেই।

 

গত পাঁচ বছরে এটি সচল হয়েছে বলে কারো জানা নেই। কৃষকদের দাবি, এই বোর্ডটি সম্পর্কে কৃষি বিভাগ অথবা ইউপি কর্তৃপক্ষ তাদেরকে কোনদিন কিছু জানায়নি। উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের পরিষদে লাগানো আবহাওয়া যন্ত্রপাতিরও একই অবস্থা।

 গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নে গিয়ে এমনই চিত্র দেখা যায়। অন্য ইউনিয়নেরও একই পরিস্থিতি। কোন কৃষক, এমনকি পরিষদের কোন সদস্যও জানেন না এই বোর্ডে আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদর্শন করার কথা।
কৃষকদের কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক নির্ভরযোগ্য তথ্য ও পূর্বাভাস জানাতে গোয়ালন্দ উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে স্থাপন করা হয় ‘রেইন গজ মিটার’ নামের এই যন্ত্র।

এতে তথ্য বোর্ড, স্বয়ংক্রিয় বৃষ্টি পরিমাপক যন্ত্র ও সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন করা হয়। তবে গত পাঁচ বছরে এসব যন্ত্রপাতির কোনটিই সচল হয়নি। যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়েছে ব্যবহার না করেই। কৃষকদের আগাম আবহাওয়ার তথ্য দেওয়ার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত পৌনে ২ লাখ টাকা খরচ করে ‘রেইন গজ মিটার’ নামের যন্ত্র বসানো হয়। ৫ বছর আগে যন্ত্রগুলো বসানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্যই পাননি কোন কৃষক।

অভিযোগ রয়েছে স্থাপনের পর একদিনের জন্য এসব যন্ত্র সচল হয়নি। অথচ এই বোর্ডের মাধ্যমে কৃষকদের জানার কথা আগামী তিন দিনের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আদ্রতা, বায়ুপ্রবাহ, আলোকঘন্টা সংক্রান্ত নানাবিধ তথ্য। বোডর্টি লাগানোর মাধ্যমেই কাজ শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ।

গত পাঁচ বছরে এটি সচল হয়েছে বলে কারো জানা নেই। কৃষকদের দাবি, এই বোর্ডটি সম্পর্কে কৃষি বিভাগ অথবা ইউপি কর্তৃপক্ষ তাদেরকে কোনদিন কিছু জানায়নি। উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের পরিষদে লাগানো আবহাওয়া যন্ত্রপাতিরও একই অবস্থা। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প সহযোগীতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে এসব আবহাওয়া যন্ত্রপাতি স্থাপন করে। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৩ সালের জুন মাসে।

অথচ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও চালু হয়নি এসব যন্ত্রপাতি। উজানচর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের গফুর মাতুব্বার পাড়ার কৃষক মোজাম্মেল শিকদার বলেন, ‘আমরা যদি তিন দিন আগেই জানতে পারতাম কুয়াশা পড়বে নাকি বৃষ্টি হবে অথবা বেশি গরম। তাহলে আমরা সেই হিসাব করে ফসলাদি চাষবাস ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারতাম। আর এতে ফসলে নানান রকমের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারতাম।’

অপর কৃষক সোনামদ্দিন শেখ জানান, বৃষ্টিপাতসহ আবহাওয়া সম্পর্কে জানতে পারলে কৃষি উৎপাদনে তাদের অনেক সুবিধা হয়। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে যে এ ধরনের ব্যবস্থা আছে, তাই তাদের জানা নেই। এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদ বা কৃষি বিভাগ তাদের কখনো কিছু জানায়নি।

দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ইদ্রিস পাড়া গ্রামের আরশাদ শেখ জানান, নানা কাজে তাদের ইউনিয়ন পরিষদে আসতে হয়। এসে এখানে শুধু বোর্ডটিই তারা দেখেছেন, এতে যে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখানে হয়, তা তারা জানতেন না। এ যন্ত্রের মাধ্যমে কোন তথ্য আজও জানতে পারেননি তারা।

শুধু তিনিই নয়, ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত কেউ এ বোর্ডের বিষয় জানেনই না। উজানচর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) মো. আবুল হোসেন প্রামানিক বলেন, ‘আমাদের পরিষদে যে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানানোর ব্যবস্থা আছে, তা আমরা নিজেরাই জানি না।

আর কৃষকরা জানবে কিভাবে? কৃষি বিভাগের অবহেলার কারণে সরকারের সময়োপযোগী ও কৃষি বান্ধব একটি উদ্যোগ মুখ থুবরে পড়েছে।’

কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নে ‘কৃষি আবহাওয়ার তথ্য পদ্ধতির উন্নতিকরণ’ প্রকল্পের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের জন্য রেইন গজ মিটার ও এর যন্ত্রাংশ বসানো হয়।

প্রতিটি যন্ত্রের বসানোর বাবাদ ব্যায় হয় অন্তত পৌনে ২ লাখ টাকা। রেইন গজ মিটার দেখাশোনার জন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অথচ ইউনিয়ন পরিষদ সংশ্লিষ্টরা জানান, বছরে একবারের জন্য কেউ এই যন্ত্রের খোঁজখবর নিয়েছে বলে তাদের জানা নেই। এমনকি কৃষি বিভাগের জন্য নিদ্দিষ্ট একটি অফিস কক্ষ থাকলেও কোনদিন কোন কর্মকর্তা সেখানে যান না।

উজানচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলজার হোসেন মৃধা জানান, দীর্ঘদিন যাবত তার ইউনিয়নে স্থাপিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানানোর যন্ত্রটি বিকল হয়ে পড়ে আছে। যন্ত্রটি তিনি নির্বাচিত হওয়ার আগে অর্থাৎ পূর্বের চেয়ারম্যান দায়িত্বে থাকা কালে স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, কৃষি কাজের সাথে আবহাওয়ার অতপ্রথ ভাবে জড়িত। আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগে থেকে জানতে পারলে কৃষক অনেক উপকৃত হবেন। তাই এই যন্ত্রটি সচল করার দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে ছোট ভাকলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমজাদ হোসেন জানান, কবে-কখন, কিভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস যন্ত্র ইউপি ভবনে স্থাপন করেছে, তা আমরা জানি না। কেউ এ বিষয়ে অবগতও করেনি। কখনো ওই যন্ত্র চালু হয়েছে কিনা তাও জানা নেই। আবহাওয়ার পূর্বাভাস কোনদিন কাউকেই জানানো হয়নি। তাহলে সেটি সচল বা বিকল থাকলে কার কি আসে যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজবাড়ী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ সব রেইন গজ মিটার নষ্ট হয়নি দাবি করে বলেন, কিছু ইউনিয়ন পরিষদে যন্ত্রপাতি ভেঙ্গে গেছে, সেগুলো মেরামতের করে সচল করা হবে। সেই সাথে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে।

Check Also

ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে জাতীয় যুব জোট রাজশাহী মহানগর শুভেচ্ছা বার্তা

॥ রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি ॥ জাতীয় যুব জোট রাজশাহী মহানগর সভাপতি শরিফুল ইসলাম সুজন ও …