মো. রেদওয়ান হোসেন, সুবর্ণচর প্রতিনিধি।।
শুরুতেই ব্যক্তিগত একটি অনুভূতি না বললেই নয়। ডাঃ আবু হোসেন সরকারের নামটি আমি প্রথম শুনেছি আমার আব্বার মুখে। আব্বা তাঁর চিকিৎসা নিয়েছেন এমন স্মৃতিও শুনেছি বহুবার। শুধু তাই নয়, আমার মহরম বাবাও তাঁকে চিনতেন ও জানতেন। সেই ছোটবেলা থেকেই নামটি আমার কাছে এক ধরনের শ্রদ্ধা ও আস্থার প্রতীক হয়ে ছিল। সময়ের সাথে বুঝেছি, তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন বরং একটি প্রজন্মের নির্ভরতার জায়গা এবং এক নিবেদিত মহাজীবনের অধিকারী।
ডাঃ আবু হোসেন সরকার জন্মগ্রহণ করেন ১৫ জানুয়ারি ১৯৩৫ সালে। পিতা আলহাজ্ব ইমাম উদ্দীন এবং মাতা বাছেরা খাতুনের স্নেহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি শৈশব থেকেই মানবসেবা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি নিজের জীবনকে গড়ে তুলেছিলেন মানুষের উপকারে নিবেদিত এক আলোকিত পথিক হিসেবে।
বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার প্রসার ও বিকাশে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি শুধু চিকিৎসা প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং এই শাস্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাসিক পারিবারিক চিকিৎসা পত্রিকা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যজ্ঞান ভাণ্ডার, যেখানে জটিল চিকিৎসাবিষয়ক ধারণাগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরা হতো।
তিনি বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন ম্যানুফ্যাকচার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এই খাতের উন্নয়ন, মানোন্নয়ন ও সংগঠিত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দি ন্যাশনাল এইচ আর ল্যাবরেটরি লিমিটেডের মাধ্যমে হোমিও ইউনানী আয়ুর্বেদিক ও কসমেটিকস পণ্যের উৎপাদনে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়, যা দেশীয় চিকিৎসা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করেছে।
শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন এক অগ্রদূত। হোমিওপ্যাথি বিষয়ক বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা সংকলন ও অনুবাদের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকদের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছেন। হোমিও কম্পারেটিভ মেটেরিয়া মেডিকা, হোমিওপ্যাথিক প্র্যাকটিশনার্স গাইড, অর্গানন অব মেডিসিন, বায়োকেমিক মেটেরিয়া মেডিকা, প্রেসক্রাইবার্স গাইডসহ তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী আজও প্রাসঙ্গিক ও সমাদৃত।
ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল গভীর। নোয়াখালী জেলা তাবলীগী মারকাজ মসজিদ এবং কাছেমুল উলূম মারকাজ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুতাওয়াল্লী হিসেবে তিনি দ্বীনি শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর জীবন ছিল চিকিৎসা সেবা ও ধর্মীয় দায়িত্ববোধের এক সুন্দর সমন্বয়। বিশ্বভ্রমণের মাধ্যমেও তিনি তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। পাঁচ মহাদেশের ৫০টির বেশি দেশ ভ্রমণ করে তিনি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হন, যা তাঁর চিন্তা ও কর্মকে আরও বিস্তৃত করেছে।
১৭ মার্চ ২০২৬ সালে তাঁর ইন্তেকাল ঘটে। তবে তাঁর কর্মময় জীবন, জ্ঞানচর্চা এবং মানবসেবার অবদান তাঁকে আজও মানুষের হৃদয়ে জীবিত রেখেছে। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিরলসভাবে মানুষের পাশে থেকেছেন এবং চিকিৎসা সেবাকে এক মহান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
ডাঃ আবু হোসেন সরকারের জীবন আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জনে নয়, বরং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করার মধ্যেই নিহিত। তাঁর এই প্রজ্ঞা, অবদান ও ত্যাগ আমাদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত লিখুন :