মো. রেদওয়ান হোসেন, সুবর্ণচর (নোয়াখালী) প্রতিনিধি:
ঘুষ, অনিয়ম, হয়রানি ও প্রশাসনিক জটিলতার একের পর এক অভিযোগের মধ্যে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ আলমকে খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় বদলি করা হয়েছে। তবে শাহ আলমের বদলির পরও উপজেলা শিক্ষা অফিসের বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষক নেতা নাসিম ফারুকীর বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, অর্থ আদায়, শিক্ষা অফিসে প্রভাব বিস্তার ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শাহ আলমের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগঃ
২০২৫ সালের ১০ মার্চ সুবর্ণচরে যোগদানের পর শাহ আলমের বিরুদ্ধে চাকরি স্থায়ীকরণ, পেনশন, ছুটি, শোকজ, সরকারি বরাদ্দ ও পাঠ্যবইসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে হজ ও মাতৃত্বকালীন ছুটিতে উৎকোচ আদায়, সন্তানদের শিক্ষা ভাতার আবেদনে অর্থ নেওয়া, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদকের ইউনিয়ন পর্যায়ের বরাদ্দ থেকে টাকা নেওয়া এবং সাব ক্লাস্টার প্রশিক্ষণের অর্থ থেকে ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ।

শিক্ষকদের অভিযোগ, অনেক সময় ফাইল আটকে রেখে অযথা হয়রানি করা হতো। বিভিন্ন বিষয়ে শোকজ দিয়ে পরে তা নিষ্পত্তির জন্য অর্থ দাবি করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নুর আলমের অভিযোগ, পেনশনের ফাইল এগিয়ে নিতে তার কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় তার কাজ আটকে রাখা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
শাহ আলমের বিরুদ্ধে সরকারি পাঠ্যবইয়ের হিসাব নিয়েও অভিযোগ ওঠে। সুবর্ণচরে শিক্ষার্থীদের বিতরণের জন্য সরবরাহ করা প্রায় ১২ হাজার বইয়ের হিসাব নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কমিটি গঠন করে। চলতি বছরের ২৯ ও ৩০ জুলাই তদন্ত কমিটি সুবর্ণচরে এসে বিষয়টি তদন্ত করে।
এ ছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংস্কারের জন্য বরাদ্দ করা ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সময়মতো ব্যয় না হওয়ায় ফেরত যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠলেও শাহ আলম তা অস্বীকার করেছিলেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ তদন্তে ৩ আগস্ট সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সঞ্চিতা দাশের নেতৃত্বে আরেকটি তদন্ত কমিটি সুবর্ণচরে এসে অভিযোগকারী শিক্ষকদের বক্তব্য নেয়। এর আগে ২১ জুলাই নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে শাহ আলমকে নোয়াখালী জেলার বাইরে বদলির সুপারিশ করে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল বলে জানা গেছে। পরে তাকে খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় বদলি করা হয়।
নাসিম ফারুকীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
শাহ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি উপজেলা শিক্ষা অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে শিক্ষক নেতা নাসিম ফারুকীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অসংখ্য শিক্ষক। তাদের অভিযোগ, শাহ আলমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষা অফিসের প্রশাসনিক কাজ, শিক্ষক বদলি, ফাইল নিষ্পত্তি ও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নাসিম ফারুকীর প্রভাব ছিল।
অভিযোগকারী শিক্ষকেরা দাবি করেন, শিক্ষা অফিসের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথিত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ আদায়েও সহযোগিতা করতেন। তাদের আরও অভিযোগ, একজন কর্মকর্তার একার পক্ষে এত বিস্তৃতভাবে অনিয়ম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই শাহ আলমের পাশাপাশি কথিত সহযোগীদের ভূমিকাও তদন্ত করা প্রয়োজন।
ইতোমধ্যে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে শাহ আলমের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষককে রাত ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত উপজেলা শিক্ষা অফিসে অবস্থানের অভিযোগও উঠে এসেছে। নাসিম ফারুকী রাতে শিক্ষা অফিসে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও কোনো অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নাসিম ফারুকীর বিরুদ্ধে শিক্ষক বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও পুরোনো। ২০১৯ সালে সুবর্ণচরে তার বিরুদ্ধে শিক্ষক বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে মানববন্ধন হয়েছিল। সে সময় অর্থের বিনিময়ে হাতিয়া থেকে সুবর্ণচরে শিক্ষক বদলির অভিযোগও ওঠে। অভিযোগের বিষয়ে তখন নাসিম ফারুকী তা অস্বীকার করে অপপ্রচার বলে দাবি করেছিলেন।
বর্তমানে নাসিম ফারুকী পশ্চিম চর জব্বর নেয়াজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সুবর্ণচর উপজেলা শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বদলি বাণিজ্য ও রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ
শিক্ষকদের একটি অংশের অভিযোগ, নাসিম ফারুকীর প্রভাব শুধু উপজেলা শিক্ষা অফিসেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অতীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও যোগসাজশের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার ছবি ও অন্যান্য তথ্য সামনে এসেছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাবের কারণে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তার প্রভাব তৈরি হয়েছিল। ফলে শাহ আলমের সময়কার অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি নাসিম ফারুকীর অতীত ভূমিকা, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং শিক্ষা প্রশাসনে তার কথিত প্রভাবও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিক্ষা সংক্রান্ত অভিযোগের বাইরে নাসিম ফারুকীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, হয়রানি ও বিভিন্ন সামাজিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ঘিরে বিভিন্ন ব্যক্তিগত অভিযোগ ছড়িয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে পরকীয়া, ভুয়া কাবিন ও পরিচয়সংক্রান্ত দাবিও রয়েছে।
এ ছাড়া সুবর্ণচর উপজেলা মডেল মসজিদের সাবেক খতিব ক্বারী আব্দুল মান্নান নাসিম ফারুকীর বিরুদ্ধে জমি নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, আট লাখ টাকায় আট শতাংশ জমি কিনলেও প্রায় আড়াই বছরেও তিনি জমি বুঝে পাননি এবং টাকাও ফেরত পাননি। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করলে উল্টো হয়রানি ও হুমকির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
বদলির পরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে
শিক্ষকদের অভিযোগ, শাহ আলম বদলি হলেই উপজেলা শিক্ষা অফিসের দীর্ঘদিনের অভিযোগের সমাধান হবে না। অভিযোগগুলোর পেছনে কারা ছিলেন, অর্থ লেনদেনে কারা জড়িত ছিলেন এবং শিক্ষক হয়রানি ও বদলি সংক্রান্ত অভিযোগে কারা সহযোগিতা করেছেন, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের প্রশ্ন, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতগুলো অভিযোগ ওঠার পর শুধু বদলিই কি যথেষ্ট, নাকি অভিযোগের সঙ্গে জড়িত কথিত সহযোগী ও প্রভাবশালীদেরও তদন্তের আওতায় আনা হবে?
শাহ আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অসত্য দাবি করে বলেছেন, তার বদলি নিয়মিত বদলির অংশ এবং এটি শাস্তিমূলক বদলি নয়। অন্যদিকে নাসিম ফারুকী তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে এগুলোকে ষড়যন্ত্র ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বলে দাবি করেছেন। অফিসিয়াল কাজের প্রয়োজনে রাতে শিক্ষা অফিসে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
সাধারণ শিক্ষক ও সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং মিথ্যা হলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি।
আপনার মতামত লিখুন :