সাতক্ষীরা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ


FavIcon
গ্লোবাল সংবাদ
  • প্রকাশিত : ১৬ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিনিধি : 


সাতক্ষীরা জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন আশাশুনি উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম এবং কাজ শেষ না করেই কাজের প্রায় সম্পূর্ণ টাকা তুলে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। এলজিইডি সাতক্ষীরার বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম তারিকুল হাসান খান এবং মেসার্স এস আর ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. শহিদুল ইসলাম ওরফে বন্দুক সোহেলের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে এই হরিলুট চালানো হয়েছে বলে দাপ্তরিক নথিপত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে।


তদন্তে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে “খুলনা বিভাগ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প”-এর অধীনে আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউপি অফিস থেকে কাপসন্ডা বাজার ভায়া বাইনতলা ও ফটিকখালী সড়কটি (ঈয: ৩০০০-৫৭৩০স) বিসি (কার্পেটিং) দ্বারা উন্নয়নের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। যার প্যাকেজ নম্বর: কউজওউচ/ংধঃ/ড-২২১/২০২৩-২৪ (ওউ ঘঙ-৯৩১৮৪৫)।


দেখা গেছে, সরকারি নথি (স্মারক নং-৪৬.০২.৮৭০০.০০০.০৭.১৮৪.২৪.৯৪১) অনুযায়ী, এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয়েছিল ৩,০৭,৪৯,১৯৮/- (তিন কোটি সাত লাখ উনপঞ্চাশ হাজার একশত আটানব্বই) টাকা। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস আর ট্রেডার্স ৪.৩৫% কম দরে ২,৯৪,১১,৬৭৪.১২ (দুই কোটি চুরানব্বই লাখ এগারো হাজার ছয়শত চুয়াত্তর) টাকায় কাজটি পায়। ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল কার্যাদেশ (ঘড়ঃরপব ঃড় চৎড়পববফ) দেওয়ার পর কাজ সমাপ্তির চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি।


সরেজমিনে অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিল পাসের রানিং অ্যাকাউন্ট শিট বিশ্লেষণ করে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, সড়কটির মোট দূরত্বের মধ্যে ২৭৩০ মিটার রাস্তার ৪০% কার্পেটিং বাকি রয়ে গেছে। অর্থাৎ, ভৌত অবকাঠামোগত কাজের মাত্র ৬০% সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে বাকি প্রায় ৪০% কাজই করা হয়নি। অথচ, নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে ধাপে ধাপে প্রায় শতভাগ বিলই ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়েছে।


প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাজ চলমান থাকা অবস্থায় একাধিক চলতি বিল উত্তোলন করা হয়েছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় চলতি বিলের মাধ্যমে ঠিকাদারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পরিশোধের সুপারিশ ও অনুমোদন দেওয়া হয়। বিল অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপে উপ-সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর রয়েছে।


এদিকে প্রাপ্ত বিলের হিসেব অনুযায়ী, কাজের মোট মূল্য ২,৯৪,১১,৬৭৪/- (দুই কোটি চুরানব্বই লাখ এগার হাজার ছয়শত চুয়াত্তর) টাকা। এর মধ্যে স্যালভেজ মূল্য হিসেবে (পুরোনো ইট/খোয়া) বাবদ কর্তন হবে ৯২,৬১,২৩২/- (বিরানব্বই লাখ একষট্টি হাজার দুইশত বত্রিশ) টাকা। তাহলে এখানে স্পষ্ট হয় শতভাগ কাজ শেষ হলে মেসার্স এস আর ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. শহিদুল ইসলাম ওরফে বন্দুক সোহেল পাবেন ২,০১,৫০,৪৪২/- (দুই কোটি এক লাখ পঞ্চাশ হাজার চারশত বিয়াল্লিশ) টাকা। অথচ গত ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে এলজিইডি সাতক্ষীরা নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম তারিকুল ইসলাম খানের বক্তব্য অনুযায়ী এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে মেসার্স এস আর ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. শহিদুল ইসলাম ওরফে বন্দুক সোহেলকে তিন ধাপে সাতক্ষীরা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম তারিকুল হাসান খান নিয়ম নীতির বাইরে গিয়ে নাম মাত্র স্যালভেজ মূল্য কর্তন করে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিতে ইতিমধ্যে ২,০২,৩২,৪১৯/- (দুই কোটি দুই লাখ বত্রিশ হাজার চারশত ঊনিশ টাকা পরিশোধ করেছেন। যার মধ্যে স্যালভেজ মূল্যের (সম্পূর্ণ অংশ) ৯২,৬১,২৩২/- (বিরানব্বই লাখ একষট্টি হাজার দুইশত বত্রিশ) টাকা কর্তন করার নিয়ম থাকলেও তিনি ৩ ধাপে কর্তন করেছেন মাত্র ৩৫,০০,০০০/- (পয়ত্রিশ লাখ) টাকা। যা সম্পূর্ণ নিয়ম বহিভূত এবং অনৈতিক বলে দাবি করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। সেই হিসেব অনুযায়ী ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস আর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শহিদুল ইসলাম ওরফে বন্দুক সোহেলের কাছে স্থানীয় সরকার (এলজিইডি) স্যালভেজ বাবদ এখনো ৫৭,৬১,২৩২/- (সাতান্ন লাখ একষট্টি হাজার দুইশত বত্রিশ) টাকা পাবেন। অথচ কাজ শেষ না হওয়া সত্বেও সাতক্ষীরা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম তারিকুল হাসান খান নিয়ম নীতির বাইরে গিয়ে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় শতভাগ টাকা পরিশোধ করেছেন। এঘটনায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।


এদিকে কাজের দুর্নীতির ঘটনায় সিডিউল অনুযায়ী জানা গেছে, ওই রাস্তায় বালু ১০ ইঞ্চি, সাবভেজ ৬ ইঞ্চি, ম্যাকাডাম ৬ ইঞ্চি, কারপেটিং পিস ১ ইঞ্চি এবং গাইড অল ১২ মিলি রড ধরা আছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ বাস্তবে সিউিলের সাথে কাজের কোন মিল নেই। তাদের দাবি, এই রাস্তার কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং প্রাইম কোর্ট ছাড়াই মেকাডামের উপরে কারপেটিং করা হচ্ছে।


স্থানীয় দক্ষিণ নদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহিন মোল্লা জানান, ‘আমাদের এই রাস্তাটা সিডিউল অনুযায়ী হচ্ছে না। কাজ এখনো অনেকটাই বাকি আছে। অথচ শুনছি এই কাজের বিল তুলে নেয়া হয়ে গেছে। সরকার বাজেট তো আর কম দেয় না, তাহলে এভাবে কাজে দুর্নীতি করবে কেন? এ বিষয়ে তিনি উদ্ধতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।’


ফোখরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ভ্যানচালক আব্দুস সামাদ প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ‘আধা ইঞ্চি পিচে কি রাস্তা তৈরি হয়? টাকা তো সরকার ঠিক মতন দিচ্ছে। তাহলে রাস্তা কেন ঠিক মতন হচ্ছে না?”


এ বিষয়ে সাতক্ষীরা এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম তারিকুল হাসান খান জানান, ‘খুলনা বিভাগের অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রকল্প আওতায় বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের কাপসন্ডা বাজার ভায়া বাইনতলা ফটিকছড়ি রাস্তার কাজটা চলমান আছে। এই প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ২ কোটি ৯৪ লক্ষ ১১ হাজার ৬৭৪ টাকা। আমরা প্রথম বিল দিয়েছি ২০২৬ সালে ৪ জানুয়ারি, দ্বিতীয় বিল দিয়েছি ২০২৬ সালে ১০ মার্চ ও তৃতীয় বিল দিয়েছি ০১ এপ্রিল ২০২৬ সালে। অর্থাৎ চলতি বিল একপ্রকার অগ্রিম বিল। কিন্তু চলতি বিল আমরা দেই কাজটা চলমান থাকা অবস্থায়। 


যে পরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয় তার একটা মেজারমেন্ট নেয়া হয়, মেজারমেন্ট নিয়েই তার ৮০% চলতি বিল দেয়া হয়। এভাবেই সে ধাপে ধাপে কাজটা করছে বা কাজটা চলমান আছে এবং এই কাজটা চলমান হিসেবে প্রথম দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ধাপে এই চলতি বিল এ পর্যন্ত প্রদান করা হয়েছে। তবে এই কাজটির এখনো চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়নি।’ কাজের অনিয়মের বিষয় তিনি জানান, ‘কাজ করতে গেলে ভুলভ্রান্তি হলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেটা বা ঠিকাদার যদি কোন অনিয়ম করার চেষ্টা করে সেটা আমাদের নজরে আসার সাথে সাথে আমরা পদক্ষেপ নিয়ে থাকি।’


এদিকে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এমন প্রকাশ্য ‘পকেটমারি’ ও সরকারি শীর্ষ কর্মকর্তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করছে ওই এলাকার সাধারণ মানুষ।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ