সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা আদালত অবমাননার (ভায়োলেশন) মামলার ২৬ জুলাইয়ের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে ন্যায় বিচার চেয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা জজ আদালতে একটি সিভিল রিভিশন মামলা দায়ের করেছেন। গত ২৯ জুলাই তিনি বাদী হয়ে এ মামলাটি দায়ের করেন। আগামী ৬ আগস্ট এ মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ন্যায় বিচারের স্বার্থে তিনি ২০১৩ সালে জমির মালিকানা দাবি করে ‘অপর প্রকার’ ১৮৪/২০১৩ মামলা ও মিস ভায়োলেশন মামলা ৩১/২০২৬ মামলা দুটি অন্য আদালতে স্থানান্তরের জন্য সিরাজগঞ্জ জেলা জজ আদালতে আবেদন করেন। আদালত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ দুটি মামলা সিরাজগঞ্জ সদর জজ আদালতে স্থানান্তর করেছেন। ফলে এ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শাহজাদপুর চৌকি আদালতের মামলার কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।

আদালত ও শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৪-৬৫ সালে শাহজাদপুর থানা পরিষদের জন্য প্রায় ১০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে তৎকালীন সরকার। এরপর ১৯৮২-৮৩ সালে সরকার শাহজাদপুর থানা কমপ্লেক্সের নামে আরো ৮ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণকৃত এই জায়গার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ একর জায়গা স্থানীয়দের দখলে চলে গেছে। বাকি সাড়ে ১২ একর জায়গা শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসনের নামে ও দখলে রয়েছে। ১৯৮৩ সালে শাহজাদপুর উপজেলা চত্বরে প্রায় ১ বিঘা জায়গার উপর শাহজাদপুর চৌকি আদালতের ভবন নির্মাণ করে সেখানে আদালতের কার্যক্রম চালু করা হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করেন। এরপর ২০১৩ সালে আওয়ামীলীগ সরকার সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্যে শাহজাদপুর উপজেলায় এ আদালতের কার্যক্রম আবারও শুরু করেন।
১৯৮৩ সালে আদালতের দক্ষিণ পাশের জমির উপর উপজেলা পরিষদ আইসিটি ট্রেনিং এন্ড রিসোর্স সেন্টার ফর এডুকেশন নির্মাণের পরিকল্পনা করে জায়গা দখলের চেষ্টা করেন। ফলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতের পক্ষে সেরেস্তাদার একটি ‘অপর প্রকার’ মামলা দায়ের করেন। এরপর তিনি ইউএনও বা বিবাদীদের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চান। যেন তারা আর কখনও সেখানে না আসতে পারেন। এরমধ্যে সেখানে উপজেলা পরিষদ আইসিটি ট্রেনিং এন্ড রিসোর্স সেন্টার ফর এডুকেশন ভবন নির্মাণ হয়ে তার কার্যক্রম চলছে।
সম্প্রতি শাহজাদপুর চৌকি আদালতের পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ নিয়ে নতুন করে শাহজাদপুর চৌকি আদালত এবং শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে আইনি দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য মামলা মকদ্দমায় গড়িয়েছে।
সেই দ্বন্দ্বের জেরে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের বিরুদ্ধে করা হয় মিস ভায়োলেশন মামলা। শুধু তাই নয়, সেই মামলায় ইউএনওকে ছয় মাস আটক রাখার আবেদনও করা হয়।
উপজেলার পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, আদালতের অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশের কপি ইউএনও সাবরিনা শারমিনের হাতে পৌঁছানোর আগেই তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার (সিভিল ভায়োলেশন) অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, গত ১৮ জুন জমি সংক্রান্ত বিষয়ে আদালত অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নোটিশ জারির নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই আদেশ বিবাদীপক্ষের কাছে পৌঁছায় গত ৩০ জুন। ইউএনও গত ২১ জুন জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত ও শাহজাদপুর উপজেলার বিশেষ সভার প্রেক্ষিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সিরাজগঞ্জের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে চৌকি আদালতের সীমানা প্রাচীরের নির্মাণকাজ স্থগিত রাখতে বলেন।
জানা যায়, গত ১৪ জুলাই আদালতের সেরেস্তাদার ইউএনওর বিরুদ্ধে সিভিল ভায়োলেশন মামলাটি করেন। ১৯ জুলাই ইউএনও লিখিত আপত্তি দাখিল করেন। তার আপত্তিতে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার পক্ষকে শুনানির সুযোগ না দিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যথাযথভাবে নোটিশ সরবরাহ করা হয়নি। সেই সাথে উল্লেখ করেন, বাদী ও আদালত একই। কারণ বাদী মামলায় উল্লেখ করেছেন যে, বাদী/আদালত (বাদী অথবা আদালত)।
ওই আপত্তিতে আদালত সম্পর্কে করা মন্তব্যকে অবমাননাকর উল্লেখ করে বিচারক গত ২৩ জুলাই আদেশে ইউএনওকে গত ২৬ জুলাই ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন। তবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এবং প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ইউএনও সময়ের আবেদন করেন। আবেদনটির সপক্ষে দাখিলকৃত কাগজপত্র সন্তষজনক হয়নি মর্মে তা নামঞ্জুর করা হয়। একই সঙ্গে জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি কার্যবিধির ২৪ ধারায় মামলা স্থানান্তরের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিবাদী পক্ষের আবেদনও খারিজ করা হয়। সেই সাথে আদালত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে আদেশ দেন, ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেই প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার। এরপর গত ৩০ জুলাই বাদীপক্ষের একতরফা সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়। তবে বর্তমানে চৌকি আদালতে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জুলাই চৌকি আদালতের আদেশটি ২৮ জুলাই বিকেলে ইউএনওর দপ্তর হাতে পান। তার আগে বিবাদী পক্ষ চৌকি আদালতে আবেদন করেও সেই আদেশের কপি হাতে পাননি বলে দাবী করেছেন।
এদিকে উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে গত ১৬ জুলাই দেওয়ানি কার্যবিধির ২৪ ধারায় মামলাটি জেলা জজ আদালতে স্থানান্তরের আবেদন করেন। ওই আবেদনের শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৬ আগস্ট। তার আগেই মূল আদালতে ভায়োলেশন মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। সরকারপক্ষ থেকে দেওয়ানি কার্যবিধির ২৪ ধারায় শুনানি করে মামলার নথি সিরাজগঞ্জ সদর আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদের সঙ্গে চৌকি আদালতের জমির মালিকানা নিয়ে চলা বিরোধ থেকেই তড়িঘড়ি করে ইউএনওর বিরুদ্ধে ভায়োলেশন মামলা করা হয়েছে বলে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে।
শাহজাদপুর উপজেলা পরিষদের সম্পদের রেকর্ড থেকে জানা যায়, চৌকি আদালত বর্তমানে যে, ০.৬৫১২ একর জমি ব্যবহার করছে। এটিও উপজেলা পরিষদের খতিয়ানভুক্ত এবং এর ভূমি উন্নয়ন কর এখনো উপজেলা পরিষদ পরিশোধ করছে। ১৯৮৩ সালের থানা কমপ্লেক্সের লে-আউট প্লানে চৌকি আদালতের জন্য প্রায় ০.৩৩৪২ একর জমি চিহ্নিত ছিল। কিন্তু আদালতের সংশোধিত আরজিতে প্রায় ৭.০৬ একর জমি আদালতের দখলে থাকার দাবি করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন অফিস ও কোয়ার্টার আদালতের জায়গায় বলে দাবী করা হচ্ছে। অপরদিকে উপজেলা পরিষদের সম্পদ বিবরণীতে এ সব স্থাপনার উল্লেখ দেখা যায়।
শাহজাদপুর সিনিয়র জজ আদালতের সেরেস্তাদার গত ২৪ জুলাই তার আবেদনে উল্লেখ করেন যে, শাহজাদপুর উপজেলা সংলগ্ন ৬ দশমিক ৬৩০০ একর জমি চৌকি আদালতের ভোগ দখলে রয়েছে। সেই জমিতে সরকারি বাজেটের আওতায় ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর থেকে সিরাজগঞ্জের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কাজ করছে। আবেদনে আরও দাবি করা হয়, প্রাচীর নির্মাণ কাজ পদাধিকার বলে ১ নম্বর বিবাদীর (জেলা প্রশাসক) নির্দেশে ৩ নম্বর বিবাদী (ইউএনও) নিয়ম বহির্ভূত ভাবে বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। গত ২০ জুলাই ৩ নম্বর আসামি কাজ বন্ধ করার জন্য হুমকি দিয়ে চলে যান।
এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভায়োলেশনের অভিযোগ তুলে সেরেস্তাদার তার আবেদনে ইউএনও বা বিবাদীদের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চান। তারা আর যেনো কখনও সেখানে না আসতে পারেন। কারণ সেখানে উপজেলা পরিষদ আইসিটি ট্রেনিং এন্ড রিসোর্স সেন্টার ফর এডুকেশন নির্মাণের পরিকল্পনা করে জমি দখলের চেষ্টা করছে।
তিনি আবেদনে আরও উল্লেখ করেন, ১ ও ৩ নম্বর বিবাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশসহ অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এই নোটিশের পর গত ১৮ জুন কারণ দর্শানোর নির্দেশ প্রদান করে অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রদান করেন আদালত। কিন্তু বিবাদীরা ১৮ জুনের মধ্যে কোনো লিখিত আপত্তি দাখিল করেননি। ফলে ১৩ জুলাই লিখিত আপত্তি দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেন আদালত।
এখানে আরও বলা হয়, আদালতের গত ১৮ জুনের কারণ দর্শানোর নির্দেশ প্রদান করে অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ বলবৎ রয়েছে। বাদী আরও উল্লেখ করেন, গত ২২ জুন ঠিকাদারের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সীমানা প্রাচীর কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। এমনকি ইউএনও গত ২১ জুলাই গণপূত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে একটি চিঠি দেন। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। বলা হয়, ইউএনও সাবরিনা শারমিন নির্মাণ ক্ষমতার অপব্যবহার করে আদালতের আদেশ অমান্য করেছেন।
অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ বলবৎ থাকা সত্বেও আদেশ না মেনে গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দিয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ করেছেন ইউএনও। সে কারণে বাদী সেরেস্তাদার ইউএনওকে ছয় মাস আটক রাখতে আদালতে প্রার্থনা করেন। সেইসাথে ইউএনওর অর্থদন্ডেরও আবেদন করা হয়। ১৯ জুলাই ইউএনও লিখিত আপত্তি দাখিল করেন। লিখিত আপত্তি গ্রহণ শুনানির জন্য নথি উপস্থাপন করা হয়।
বিচারকের আদেশে বলা হয়েছে, ইউএনও তার আপত্তিতে বিচারককেই বাদী হিসেবে কটাক্ষ করে উল্লেখ করেছেন। শাহজাদপুর সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের সেরেস্তাদার মামলার বাদী হিসেবে মামলা করায় প্রকৃতপক্ষে বিচারক নিজেই বাদীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এছাড়া ইউএনওর স্বাক্ষরিত আপত্তিতে আরও বলা হয়েছে, বিবাদীকে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়ে অবহেলা ও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এছাড়াও বিবাদীকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নোটিশ প্রদান না করে এই আদেশ প্রদান করেছেন।
আদেশে বিচারক আরও বলেন, আদালত স্বপ্রণোদিতভাবে কোন আদেশ প্রদান করেননি। ইউএনওর আপত্তিতে আদালতের বৈধ আদেশকে উদ্দেশ্য প্রণোণিত ও যোগসাজসী আদেশ বলা হয়েছে। ওই দিন আদালত আদেশ দেন যে, ২৬ জুলাই সকাল সাড়ে ৯ টায় ইউএনও নিজে হাজির হয়ে তার আপত্তির ব্যাখ্যা প্রদান করবেন। সেদিন আপত্তি বিষয়ক শুনানি হবে। যদি ইউএনও হাজির না হন, সেক্ষেত্রে আইনানুগ আদেশ প্রদান করা হবে। ইউএনও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ও প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সময়ের আবেদন করেন। কিন্তু তা নামঞ্জুর করা হয়। আদালত তখন ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেই প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে। এদিকে, চৌকি আদালতের সেরেস্তাদার মামলার আরজিতে দাবি করেন, উপজেলা পরিষদের গেজেটেড, নন-গেজেটেড কোয়ার্টার তাদের দখলে রয়েছে।
উপজেলা পরিষদের সম্পদ বিবরণীর তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করে চৌকি আদালত পক্ষের আইনজীবি এ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন জানান, ইউএনওর বিরুদ্ধে ভায়োলেশন মামলা সঠিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে। এখানে তড়িঘড়ি করে কিছু করা হয়নি। আদালত প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যুৎ ও টেলিফোন বিল আদালত পরিশোধ করে আসছে। এ ছাড়া আদালতের প্রথম কার্যক্রম ডরমেটরিতে শুরু হয়। এরপর আদালত ভবন নির্মাণ হলে সেখানে স্থান্তর করা হয়। আদালত ভবনের পশ্চিমের পুকুর ও কোয়ার্টার গুলিও আদালতের। এক সময় সেখানে আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা বসবাস করতো।
অপরদিকে উপজেলা পরিষদের নথিতে বলা আছে, উপজেলা পরিষদের গেজেটেড, নন-গেজেটেড কোয়ার্টার এবং ডরমেটরি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসবাস করছেন। সেগুলোর বিদ্যুৎ বিল, খাজনা, গ্যাস বিল উপজেলা পরিষদ পরিশোধ করছে।
শাহজাদপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান মনির জানান, তার অফিস সহ উপজেলা তথ্য আপার কার্যালয় সরিয়ে নিতে বলেছে শাহজাদপুর চৌকি আদালতের কর্মচারিরা। তিনি বলেন, তাদের দাবী, কোয়ার্টার, ডরমেটরি, পুকুর সব তাদের। আরজিতেও একই বিষয় বাদী উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে ডরমেটরি রুমে বসবাস করা শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মী বাবুল হাসান, সমাজসেবা অফিসের নৈশ প্রহরী লিটন হোসেন, বিআরডিবির মাঠকর্মী শাহাদত হোসেন জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে ডরমেটরিতে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু সম্প্রতি আদালতের কিছু কর্মচারী তাদের রুম ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন।
এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাইফুল বারী ও একাডেমিক সুপারভাইজার মো: মিলন হোসেন জানান, তারা কোয়ার্টার ভবনে পরিবারসহ বসবাস করেন। কোয়ার্টারগুলো উপজেলা পরিষদ দেখভাল করেন। তাদেরকেও ভবন ছেড়ে চলে যেতে বলেছে চৌকি আদালতের কর্মচারিরা।
এ আদালতের নাজির রবিউল ইসলাম জানান, এ আদালতে ১০ হাজারের উপরে মামলা রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও আদালতের কার্যক্রম পাশাপাশি চলতে থাকায় আদালতের কাজে নানা জটিলতা ও নিরাপত্তার বিঘœ ঘটছে। ফলে আইন মন্ত্রনালয় হতে অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রাচীরের কাজ শুরু করেন গণপূর্ত অধিদপ্তর। নির্মাণ কাজের প্রায় ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এরমধ্যে উপজেলা প্রশাসন গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে আদালতের সেরেস্থাদার বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।
এ বিষয়ে বাদী সেরেস্তাদার শরিফুল ইসলাম জানান, ১৯৮২ সালে এই জমি জেলা প্রশাসন অধিগ্রহণ করে। সেই থেকে এই সম্পত্তি আদালতের ভোগদখলেই আছে। ২০১৩ সালে উপজেলা পরিষদ আদালতের জায়গায় আইসিটি ট্রেনিং এন্ড রিসোর্স সেন্টার ফর এডুকেশন নির্মাণের জন্য জমি দখলের চেষ্টা করে। এ নিয়ে আদালতে একটি ‘অপর প্রকার’ মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইউএনও আদালতের প্রাচীর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। ফলে আদালতে একটি মিস ভায়োলেশন মামলা হয়। এর জবাবে আদালতকে কটাক্ষ অবমাননাকর মন্তব্য উপস্থাপন করায় আদালত তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশানমন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। এ সংক্রন্ত মামলাটি বর্তমানে সিরাজগঞ্জ সদর জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এদিকে আদালতের একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিখিত ভাবে গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় আদালতের নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। এতে আদালতের নিরাপত্তা ঝুকির মধ্যে পড়েছে। অপর দিকে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের সচিবকে নির্দেশ দেন আদালত। ফলে বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করেছে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা জজ আদালতের জিপি ও শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষের আইনজীবি এ্যাডভোকেট আলীমুল হক বলেন, শাহজাদপুর চৌকি আদালতে একটি মামলা হয়েছে ২০১৩ সালে। মূলত জায়গার মালিকানা নিয়ে মামলাটি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মামলাটির কোনো কার্যক্রম ছিল না। যে সম্পত্তিটি নিয়ে মামলাটি চলমান মূলত সেটি উপজেলা প্রশাসনের। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে থেকে উপজেলা প্রশাসন জায়গাটি অধিগ্রহণ করেছে। এর সমস্ত কাগজপত্র ও প্রমানাদি রয়েছে। আদালত দাবি করতেছে এটি তাদেরকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু এর সপক্ষে কোনো কাগজপত্র দাখিল করতে পারে নাই। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তার জন্য আদালত প্রাচীর দিতেই পারেন, তবে জায়গার মালিকের কাছে থেকে অনুমতি নিয়ে করাই ভালো।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তর নির্বাহী প্রকৌশী মাহমাদুল হাসান বলেন, শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের চিঠি পেয়ে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে নতুন করে অনুমতি পেলে কাজ শুরু করা হবে।
এদিকে চৌকি আদালত ও উপজেলা প্রশাসনের এই দ্বন্দ্ব দ্রুত নিরসন হয়ে সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসুক এটাই এখন শাহজাদপুরবাসীর প্রত্যাশা।
আপনার মতামত লিখুন :