আবুল হোসেন, রাজবাড়ী জেলা প্রতিনিধি
সরকার যখন আধুনিক কৃষি ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘পার্টনার’ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তখন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি অফিসে দেখা গেল এক ভিন্ন চিত্র। মাঠের প্রকৃত কৃষকদের অন্ধকারে রেখে অনেকটা ‘গোপনেই’ সম্পন্ন করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ‘গ্যাপ (GAP) সার্টিফিকেশন প্রশিক্ষণ’।
অভিযোগ উঠেছে, প্রশিক্ষণের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন কৃষি কর্মকর্তার পছন্দের মানুষ ও ভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা। প্রশিক্ষণ শেষে বিতরণ করা হয়েছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার আগাম স্বাক্ষর করা ‘ফাঁকা সনদপত্র’।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি অফিসে দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রশিক্ষণার্থীদের সারিতে বসে আছেন কলেজ পড়ুয়া ছাত্র, মুদি দোকানদার, চালক ও গৃহিনীরা। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, এই প্রশিক্ষণ পাওয়ার কথা ছিল সরাসরি চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকদের।
প্রশিক্ষণে আসা মাফফুজা খাতুন নামের এক গৃহিনী সরাসরি স্বীকার করেন, তিনি কীভাবে তালিকায় এসেছেন তা জানেন না। তিনি বলেন, আমার স্বামী কৃষক, সে বিয়ে বাড়িতে গেছে দেখে আমি চলে আসছি। আমি জীবনে এই প্রথম কোনো কৃষি প্রশিক্ষণে আসলাম।
রানা শেখ নামের এক ছাত্র জানান, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে তিনি এসেছেন কারণ তার বাবা সময় পাননি। একই চিত্র দেখা যায় উজানচর ইউনিয়ন থেকে আসা সামির হাসান ও নাছিমা আক্তারের ক্ষেত্রেও। কোনোদিন কৃষি জমিতে কাজ না করা ব্যক্তিরা এখন সরকারি সনদে ‘প্রশিক্ষিত কৃষক’!
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে যে সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে, তাতে প্রশিক্ষণার্থীর নাম-ঠিকানা বা কোনো তথ্যই ছিল না। অথচ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার স্বাক্ষর আগে থেকেই সেখানে শোভা পাচ্ছিল। এই ফাঁকা সনদ বিতরণের মাধ্যমে জালিয়াতির বড় সুযোগ তৈরি করে রাখা হয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রশিক্ষণার্থী খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, বিরিয়ানির নামে যা দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের। মানসম্মত কোন খাবার দেয়া হয়নি। মুসতাক নামের এক কৃষক বলেন, আমরা রোদে পুড়ে ফসল ফলাই, অথচ কৃষি অফিসে কী হয় তা জানতেই পারি না। যারা কোনোদিন মাটি স্পর্শ করেনি, তারা সার্টিফিকেট নিয়ে যাচ্ছে। এটা আমাদের সাথে প্রতারণা।
দৌলতদিয়া ইউনিয়নের আরেক কৃষক, রমজান আলী বলেন, সারা জীবন কৃষি কাজ করি। নিজের জমি আছে। কৃষি অফিসে কোন প্রশিক্ষণের আমন্ত্রণ পাই না। কৃষি অফিসারদের পছন্দের লোক দিয়ে তারা প্রশিক্ষণ দেন।
এবিষয়ে দেবগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি, মো. ইসমাইল মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, কৃষি অফিস নিয়মিতভাবে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে নামধারী কিছু ব্যক্তিকে গোপনে এসব প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এমনকি দেবগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক সরকারি কৃষক কার্ড পেয়েছেন, তাদেরকেও এ ধরনের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য ডাকা হয়নি।
তিনি এই অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বিষয়ে জানতে চাইলে, গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, সৈয়দ রায়হানুল হায়দার অনেকটা দায়সারা বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তালিকাটি আমার যাচাই করা হয়নি। তবে আমার বিশ্বাস তারা কৃষি পরিবারের সদস্য। অনৈতিক সুবিধার প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রকৃত কৃষকদের কেন জানানো হলো না—এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
বিষয়টি নিয়ে রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা, গোলাম রাসূল বলেন, সরকারি প্রশিক্ষণে অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি সহ্য করা হবে না। এবিষয়ে অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :