মোংলা সোনাইলতলা ইউপি তথ্যসেবা কেন্দ্রের আড়ালে দুর্নীতির সাম্রাজ্য, রোষানলে মা-ছেলে


FavIcon
গ্লোবাল সংবাদ
  • প্রকাশিত : ০৪ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

মাসুদ রানা, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি।।


মোংলা উপজেলার ৫ নম্বর সোনাইলতলা ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিক সেবা এখন এক ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতায় বন্দী হয়ে পড়েছে। ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের (উদ্যোক্তা) পদে থেকে অম্বরিশ মজুমদার দীর্ঘ দিন ধরে তথ্য সেবার নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।


 জালিয়াতি, ঘুষ গ্রহণ, জমি দখল এবং প্রতিবাদীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে তিনি এখন ওই এলাকার এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। ক্ষমতার বলে জোরপুর্বক বাড়ি দখল করতে গিয়ে মা-ছেলেকে পিটিয়য়ে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়ারও অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। সোনাইলতলা জয়খাঁ গ্রামে এ ঘটনা। প্রতিকার চেয়ে থানায় অভিযোগ দিলেও অম্বরিশ বাহিনীর ভয়ে কোন বিচার পাচ্ছে না ভুক্তভোগী পরিবারটি। তাদের এখন দিন কাটছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়।


অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সোনাইলতলা ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রে (উদ্যোক্তা) পদে কাজ শুরু করেন অম্বরিশ মজুমদার। অভিযোগ রয়েছে, এই পদের আড়ালে তিনি ডিজিটাল জালিয়াতির এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। জন্ম নিবন্ধন ও ওয়ারিশ কায়েম সনদের মতো জরুরি সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত সরকারি ফির চেয়ে বহুগুণ বেশি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। টাকা না দিলে মাসের পর মাস ঘোরানো এবং সেবাপ্রার্থীদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করাই তাঁর নিয়মিত চিত্র। 


এই অবৈধ আয়ে মোংলা ও জয়খাঁ এলাকায় তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ, বাড়ি ও গাড়ি গড়ে তুলেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সোনাইলতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও অম্বরিশের এই বেপরোয়া আচরণের কাছে অনেকটাই কোণঠাসা। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছেমতো অফিস পরিচালনা করেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।


অম্বরিশ মজুমদারের নৃশংসতার এক চরম উদাহরণ পাওয়া গেছে জয়খাঁ গ্রামে। অভিযোগ রয়েছে, অম্বরিশ ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী পাশের বাড়ির অসহায় মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই অবৈধ দখলদারিত্বের প্রতিবাদ করায় গত কয়েক দিন আগে সৌরভ মন্ডল নামে এক যুবক এবং তাঁর মায়ের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা তাঁদের পিটিয়ে হাত ও পা ভেঙে দেয়। গুরুতর আহত মা ও ছেলে বর্তমানে শয্যাশায়ী থাকলেও অম্বরিশের ভয়ে এখনো বাড়ি থেকে বেড় হতে পারছেন না। এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ দিলে ওসির নির্দেশনায় গতকাল দুই পক্ষকে থানায় ডাকে পুলিশ অফিসার। কিন্ত অম্বরিশ ও তার সাথে থাকা সাঙ্গপাঙ্গরা থানার বিচার না মেনে এলাকায় বিচার হবে বলে থানা থেকে বের হয়ে যায়। ফলে সুষ্ঠ বিচার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে অসহায় ওই পরিবারটি।


ভুক্তভোগী সৌরভ মন্ডলের পরিবার জানায়, এ ঘটনায় মোংলা থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ দেওয়ার পর অম্বরিশ ও তাঁর সহযোগীরা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য পরিবারটিকে প্রতিনিয়ত জীবন নাশের হুমকি দিচ্ছে। পরিবারটি বর্তমানে নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ অবস্থায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অম্বরিশের একটি প্রশিক্ষিত ‘হেলমেট বাহিনী’ রয়েছে যারা প্রতিবাদ করলেই হামলা ও মিথ্যা মামলার ভয় দেখায়। অম্বরিশের বিরুদ্ধে এলাকায় অসামাজিক কর্মকান্ডেরও অভিযোগ রয়েছে।


সোনাইলতলা ইউনিয়নের ভুক্তভোগী নাগরিক ও সচেতন সমাজ অবিলম্বে অম্বরিশ মজুমদারকে তাঁর পদ থেকে অপসারণ এবং তাঁর অবৈধ সম্পদের উৎস তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে সৌরভ মন্ডল ও তাঁর মায়ের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।


এ বিষয়ে সোনাইলতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নার্জিনা আক্তার নাজিনা বলেন, অম্বরিশ মজুমদারের বিরুদ্ধে নাগরিক সেবা দিতে গিয়ে টাকা দাবি করা এবং সাধারণ মানুষের সাথে দুর্ব্যবহারের বেশ কিছু মৌখিক অভিযোগ আমি পেয়েছি। একজন উদ্যোক্তার কাছে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা জিম্মি হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমি বারবার তাকে সতর্ক করা সত্ত্বেও সে তার আচরণ সংশোধন করেনি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পরিষদ পরিচালনায় সে আমাকেও পাশ কাটিয়ে চলার চেষ্টা করে, যা দাপ্তরিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী। আর সৌরভ মন্ডল ও তার মায়ের ওপর হামলার বিষয়টি যদি সত্য হয় তাহলে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যাবস্থা নেয়ার দাবী তার।


এ বিষয়ে অভিযুক্ত অম্বরিশ মজুমদার বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার কোনো ভিত্তি নেই। আমি সরকারি নিয়ম মেনেই ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে সেবা দিয়ে আসছি। আর সৌরভ মন্ডল পরিবারের সাথে আমাদের পারিবারিক জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। ওইদিন কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ধস্তাধস্তি হয়েছে মাত্র, কাউকে পৈশাচিক নির্যাতন করা হয়নি। আমি কোনো অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়িনি, যা করেছি তা আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসল। চেয়ারম্যানের সাথেও আমার কোনো দূরত্ব নেই।


এ বিষয়ে মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, সোনাইলতলা ইউনিয়নে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মা ও ছেলের ওপর হামলার একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অম্বরিশ মজুমদার বা অন্য যাদের নামই আসুক না কেন, অপরাধী সাব্যস্ত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, অসহায় পরিবারটিকে ভয়ভীতি বা হুমকি দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, সে ব্যাপারেও পুলিশ সতর্ক রয়েছে। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা দেখছি। খুব দ্রুতই আসামিদের আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হবে।


সোনাইলতলা ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রম এবং জয়খাঁ গ্রামের আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন এক জটিল পর্যায় গিয়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের পঙ্গগুত্ববরণ ও আর্তনাদ, অন্যদিকে অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থন সব মিলিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। ওসির নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস এবং ইউপি চেয়ারম্যানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ এখন কতটা কার্যকর হয়, তা-ই দেখার বিষয়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে সোনাইলতলার নাগরিক সেবার পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনার দাবী এলাকাবাসীর। 


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ