পাবনা জেলা প্রতিনিধি।।
সেতু আছে, কিন্তু সেতুতে ওঠার পথ নেই। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় কাদা-পানি। আর সেই দুর্গম পথ পেরিয়ে সেতুতে উঠতে এলাকাবাসীর একমাত্র ভরসা এখন বাঁশের তৈরি অস্থায়ী ব্যবস্থা। একটু অসাবধান হলেই পা পিছলে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
দেড় বছর আগে সরকারি অর্থে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি আধুনিক গার্ডার সেতু। কিন্তু সেতু নির্মাণের পর সংযোগ সড়ক, সুরক্ষা দেয়ালসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ না করেই বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণকাজ। ফলে কোটি টাকার সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি এখনো মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের উপযোগী হয়নি। পাবনার ফরিদপুর উপজেলার বিএলবাড়ী ইউনিয়নের দেওভোগ-দহপাড়া গ্রামে দেখা গেছে এমন চিত্র। দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি অচল পড়ে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কৃষক, মসজিদে যাতায়াতকারী মুসল্লি ও সাধারণ পথচারীদের প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
সময় বাড়লেও শেষ হয়নি কাজ: উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর এক কোটি ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৯৫ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। নির্ধারিত সময়ে ঠিকাদার কেবল সেতুর মূল কাঠামোর কাজ শেষ করেন। কিন্তু সংযোগ সড়ক, সুরক্ষা দেয়ালসহ প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক কাজ অসমাপ্তই থেকে যায়।
পরে এসব কাজ শেষ করার জন্য চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। তবে বর্ধিত সময়সীমা পার হয়ে গেলেও সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়নি। ফলে নির্মাণের প্রায় দেড় বছর পরও সেতুটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয়রা।
ঝুঁকি নিয়ে পারাপার নারী-শিশুরা: সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির দুই প্রান্তেই রয়েছে জলাবদ্ধতা ও কাদা। কোথাও নেই চলাচলের উপযোগী সংযোগ সড়ক। বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা বাঁশ বসিয়ে তৈরি করেছেন অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা। সেই বাঁশের ওপর দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হচ্ছেন নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেতুর পূর্ব পাশে রয়েছে দহপাড়া জামে মসজিদ এবং পশ্চিম পাশে দহপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ফলে প্রতিদিন দুই পাশের মানুষের যাতায়াতের জন্য সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি যেন মানুষের উপকারের বদলে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কাদা-পানিতে পিচ্ছিল হয়ে যায় দুই প্রান্ত, তখন বাঁশের ওপর দিয়ে শিশুদের পারাপার যেন প্রতিদিনের একেকটি ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা।
দুর্ভোগ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ: দহপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা নূর মোহাম্মদ বলেন, "আমি দেওভোগ থেকে দহপাড়া মসজিদে ইমামতি করতে আসি। প্রতিবারই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাদার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। এই কষ্টের কারণে অনেকে মসজিদে আসতেও আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিষয়টি খুবই অমানবিক।"
স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, "দেড় বছর হলো ব্রিজটি হয়েছে। এখনো সংযোগ সড়ক হয়নি। আমরা ব্রিজের সঙ্গে বাঁশ লাগিয়ে পারাপার হচ্ছি। ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত ব্রিজটির বাকি কাজ শেষ করা হোক।"
আরেক বাসিন্দা আব্দুল কাদের গণি বলেন, "সেতুটি নিয়ে আমরা অনেক হতাশায় আছি। আমাদের একটাই দাবি, সেতুটির পূর্ণাঙ্গ সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে এটি চলাচলের উপযোগী করা হোক।"
প্রশাসনের তাগাদা, অধরা পিআইও: স্থানীয়দের অভিযোগ, সংযোগ সড়কসহ অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে বিষয়টি জানানো হলেও দীর্ঘদিন ধরে শুধু আশ্বাসই মিলছে, বাস্তবে কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। প্রকল্পটির কাজ দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত থাকার কারণ খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে ফরিদপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মানিকুজ্জামান জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে ইমামা বানিন বলেন, "ঠিকাদারকে সংযোগ সড়কসহ বাকি কাজ শেষ করার জন্য বারবার তাগাদা দেয়া হয়েছে। কাজ যথাযথভাবে শেষ না করলে ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিল দেওয়া হবে না।
আপনার মতামত লিখুন :