পশুরা নদীর ঢেউ আর গহীন বনের দস্যুতা নিয়ন্ত্রনের বড় চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে নতুন ওসির ‘অগ্নিযাত্রা’


FavIcon
গ্লোবাল সংবাদ
  • প্রকাশিত : ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

মাসুদ রানা, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি।।


দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল, মোংলা সমুদ্র বন্দর, সুন্দরবনের সম্রাটদের আধিপত্য, মাদক আর রাজনৈতিক অস্থিরতার নানা মুখী চ্যালেন্স মাথায় নিয়ে মোংলা থানায় নতুন (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আতিকুর রহমান। তবে তাঁর এই যোগদান সাধারণ কোনো রদবদল নয়, বরং মোংলার জলপথ, সড়ক পথ, বনপথ এবং সমতলের বিশাল এক অপরাধ সামরাজ্যের চ্যালেঞ্জকে সঙ্গী করে থানায় যোগদান করলেন তিনি। আগের ওসির মাত্র ৪ মাসের মাথায় হঠাৎ করে রহস্যজনক বদলি উপজেলার সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যা নতুন ওসির জন্য এক প্রকার ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বন্দর কেন্দ্রিক মাফিয়া চক্র, সুন্দরবনের পুনর্জাগরিত দস্যুতা এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চলা সন্ত্রাস, মাদক আর দখলবাজির যে বিষবাষ্প মোংলাজুড়ে ছড়িয়েছে, তা নির্মূল করাই হবে নবাগত ওসির প্রধান চ্যালেন্স।


বন্দর সংশ্লিষ্টরা ব্যাবসাযীরা জানান, বন্দর চ্যানেলের পশুর নদীতে ‘সাদা পোশাকের’ দস্যুতা ও জাহাজ কেন্দ্রিক কয়েকটি বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। নতুন ওসির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোংলা বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি পন্য বোঝাই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা। এখানে কয়েকটি শক্তিশালী চক্র ভুয়া লাইসেন্সধারী জলযান ও স্প্রিট বোট ব্যবহার করে মাঝনদীতে জাহাজ থেকে মূল্যবান যন্ত্রাংশ, প্যানেল বোর্ড এবং ইঞ্জিন অয়েল (জ¦ালানী তেল) পাচার করে আসছে। এছাড়া পশুর নদীতে নোঙর করা হাজার হাজার লাইটার ও কার্গো জাহাজ থেকে পণ্য চুরির ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই বিশাল ‘তেল চোর’ ও ‘যন্ত্রাংশ পাচারকারী’ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা ওসির জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা।

সন্ত্রাসীদের কাছে একটি বড় অর্থ ভান্ডার এখন সুন্দরবেন। সেখানে দস্যুতার নবউত্থান ও বন্যপ্রাণী পাচার হচ্ছে অসাধু লোকদের অর্থ উপার্জনের স্থান। দীর্ঘদিন শান্ত থাকার পর পুর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরনখোলা রেঞ্জে আবারও ৮ থেকে ১০টি নতুন বনদস্যু বাহিনী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সম্প্রতি করিম শরীফ, বড় জাহাঙ্গীর, ছোট সুমন, বড় সুমন, আসাবুর ও দয়াল বাহিনীর হাতে জেলে অপহরণ ও মুক্তিপণের দাবিতে বনজীবীদের হামলা ও মারধরেরমাঝে হাহাকার শুরু হয়েছে। শুধু দস্যুতা নয়, বনের ভেতর দিয়ে বাঘ-হরিণের মাংস-চামড়া এবং মূল্যবান সুন্দরি কাঠ পাচারের রুটগুলো আবারও সচল হয়েছে। র‌্যাব, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগের সাথে সমন্বয় করে এই গহীন অরণ্যে শান্তি ফেরানোই হবে নতুন ওসির অন্যতম বড় অগ্রাধিকার।


মাছের ঘের, বাড়ির জমি দখল ও রাজনৈতিক ভূমিদস্যুদের আয়ের একটি বড় উৎস্য। মোংলার সমতলের চিত্র আরও ভয়াবহ। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও ‘নেতা’ পরিচয়ধারী এক শ্রেণির সন্ত্রাসী সাধারণ মানুষের পৈত্রিক জমি ও মাছের ঘের দখলের নেশায় মেতেছে। অসহায় মানুষের কান্নার আওয়াজ অনেক সময় থানার দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে যারা ভূমিদস্যুতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে, তাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হবে নতুন ওসির জনবান্ধব পুলিশিংয়ের বড় চ্যালেঞ্জ।

মাদকের করাল গ্রাসে মোংলা সমুদ্র বন্দরের সড়ক ও জলপথ ও সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খাল একটি বড় রুট। মোংলা এখন মাদকের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে সুন্দরবন বেষ্টিত দুর্গম পথগুলো দিয়ে মাদকের বড় বড় চালান ঢুকছে। যুব সমাজকে এই মরণনেশা থেকে বাঁচাতে হলে মাদকের খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি এর নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশী মাদক প্রবেশের রুটগুলো চিহ্নিত করে তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা তাঁর অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত পুলিশ প্রশাসনের।


নাগরিক সমাজ নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সচেতন মহলের চাওয়া হচ্ছে, সুন্দরবন বেষ্টিত মোংলা অঞ্চলকে মাদকের একটি নিরাপদ ‘ট্রানজিট রুট’ হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা। বনের গহীন পথ দিয়ে মাদক প্রবেশের প্রতিটি রুট চিহ্নিত করে তা সমূলে উৎপাটন না করলে এ অঞ্চলের যুবসমাজকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।


 রাজনৈতিক পরিচয়ধারী মাদকের গডফাদারদের চিহ্নিত করে তাদের শিকড় উপড়ে ফেলার সাহসী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে নতুন ওসির পেশাদারিত্ব। মোংলার সাধারণ মানুষ আজ নানামুখী অপরাধের জালে জিম্মি। নবাগত ওসির কাছে মোংলাবাসীর প্রত্যাশা, পুলিশ হবে অপরাধীদের যমরাজ আর ভুক্তভোগীদের বন্ধু। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কোন্দলকে ছাপিয়ে পুলিশের নিরপেক্ষতা বজায় রেখে মোংলাকে একটি সন্ত্রাস ও দস্যুমুক্ত জনপদে রূপান্তর করতে পারবেন কি নবাগত ওসি? এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে তার সফলতার গল্প। রুটিন ডিউটি নয়, বরং মেধা, সাহস ও সততার সমন্বয় ঘটিয়ে মোংলার এই ‘ক্রাইম জোন’গুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনাই হবে নতুন ওসির কর্মজীবনের অন্যতম বড় সার্থকতা।


সব মিলিয়ে মোংলাকে সন্ত্রাস আর অপরাধমুক্ত করা এবং পুলিশের হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা নতুন ওসির এই পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ নয় মোটেও, আইনশৃঙাখলা বাহিনীর ইচ্ছা আর আইনের চোখঁ ঠিক রাখলে সব কিছুই নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ